সারাদেশ

যুদ্ধাহত শিশু শোয়েব এলাহী, স্বীকৃতি চান মা

এখনই সময় :

শোয়েব এলাহী, মূক ও বধির। মানে কথা বলতে পারেন না, আবার কানেও শোনে না। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শত্রুপক্ষের মর্টার বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দে শোয়েব এলাহীর কান ফেটে যায়। সে সময় মাত্র ১০ মাসের শিশু শোয়েব ভারতে শরণার্থী হিসেবে বসবাসরত তার মায়ের কোলে ছিলেন। তার বাবা ভারতের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে গিয়ে শরণার্থী বাঙালিদের রেশন সরবরাহ করতেন ও পাকিস্তানি হানাদারদের গতিবিধি গোপনে পর্যবেক্ষণ করে মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য দিতেন। মূলত পাকিস্তানি হানাদাররা শোয়েব এলাহীর মাকে লক্ষ্য করে মর্টার ছুড়ছিল। ভাগ্যক্রমে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তাদের অদূরে পড়ে মর্টার বিস্ফোরিত হয়। সে থেকে আজ ৪৬ বছর ধরে মূক ও বধির জীবন কাটাচ্ছেন শোয়েব এলাহী। মুজিববর্ষে প্রধানন্ত্রীর কাছে সরকারি স্বীকৃতির দাবি জানিয়েছেন মা শামছুর নাহার।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান উপজেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি প্রয়াত এম এ, সবুর ও শামছুন নাহারের দ্বিতীয় সন্তান শোয়েব এলাহী। যখন যুদ্ধের দামামায় চারদিক সরগরম। রাজনীতিবিদ বাবা এম এ সবুর মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করছেন। কমলা খাঁন, কুতুব খাঁন, চেরাগ আলীসহ এলাকার অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে উত্তরভাগস্থ নিজের বাড়ির বৈঠকখানায় গোপন সভা করে শলাপরামর্শ করতেন। মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে স্থানীয় শান্তি কমিটির সদস্য ও রাজাকাররা রাতের আঁধারে সে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিল। এলাকার সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজন আতঙ্কিত হয়ে পলো। এম এ সবুর কয়েকটি হিন্দু পরিবারকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের হালাহালি শহরে পৌঁছে দিলেন। সাথে তার স্ত্রী শামছুন নাহার, আড়াই বছরের শিশু কন্যা ইশরাত জাহান বীথি ও ৯ মাসের শিশুপুত্র শোয়েব এলাহী। তারাও আশ্রয় নিলেন ভারতের থানাবাজার এলাকার পারকুল গ্রামে এক হিন্দু বাড়িতে।

শোয়েব এলাহীর মা শামছুন নাহার জানান, তাদেরকে জনৈক নগেন্দ্র দেবের বাড়িতে রেখে স্বামী এম এ সবুর বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সুসংগঠিত করা, ধলাই সীমান্ত পেরিয়ে তাদেরকে ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পৌঁছে দেওয়া এবং পাকিস্তানি সৈন্যদের গতিবিধি গোপনে পর্যবেক্ষণ করে মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য সরবরাহের কাজে ব্যস্ত হযে গেলেন। এ ছাড়াও তৎকালীন এম এন এ মুক্তিযুদ্ধে চার নম্বর সেক্টরের ডেপুটি কমান্ডার মোহাম্মদ ইলিয়াসকে নিয়ে ভারতের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে শরণার্থীদের রেশন ও রসদ সরবরাহ করতেন।

এপ্রিল মাসের কোনো এক দুপুর। বাড়িতে বৃদ্ধ শ্বশুর একা রয়েছেন। এর মধ্যে খবর এলো রাজাকাররা জমির পাকা ধান কেটে নিয়েছে। স্বদেশ আর নিজের বাড়ির চিন্তায় অস্থির শামছুন নাহার শোয়েব এলাহীকে কোলে নিয়ে নগেন্দ্র দেবের বাড়ির উঠানে পায়চারি করছিলেন। হঠাৎ অদূরে হেলমেট মাথায় জলপাই রঙের ইউনিফর্ম পরা কয়েকজন সৈন্য চোখ পড়ল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই আকাশ ফাঁটানো শব্দে একটি মর্টার এসে বিস্ফোরিত হলো শামছুন নাহারের পায়ের কাছে। ছেলেকে কোলে নিয়েই দৌড়ে পালালেন বাড়ির আড়ালে। পরদিনই বাড়ি বদল করে চলে গেলেন হালাহালি গ্রামের শরফ উদ্দিনের বাড়িতে।

কিন্তু শোয়েবকে ডাকলে আর সাড়া দেয় না। অনেক ডাক্তার দেখালেন। কোনো লাভ হয়নি। মাসের পর মাস অপেক্ষা করলেন। সন্তানের মুখ থেকে আর মা ডাকটি শুনতে পেলেন না। ডাকলেও আর সাড়া মিলছে না। ইশারাতে চলছে বাক্যবিনিময়। সবাই বললেন, মর্টারের প্রচণ্ড শব্দে শিশুটির কান ফেটে গেছে। কাঁদতে কাঁদতে মায়ের চোখের জলও শুকিয়ে গেল। দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু মুখের ভাষা ফিরে পেল না মায়ের কোলের সে নিষ্পাপ শিশু। সে থেকে আজ অবধি মূক ও বধির হয়ে জীবন কাটাচ্ছেন শোয়েব এলাহী। সিলেট শেখঘাট মূক ও বধির বিদ্যালয়সহ ঢাকা ও ফরিদপুরের বিভিন্ন মূক ও বধির বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন। খুব ভালো ছবি আঁকতে পারেন। জীবিকার তাগিদে এখন গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকায় একটি গার্মেন্ট কারখানায় সামান্য বেতনে কাজ করছেন। এক কন্যা সন্তানের জনক শোয়েব এলাহীর স্ত্রী পারভিন বেগমও জন্ম থেকেই মূক ও বধির।

মহান মুক্তিযুদ্ধের নায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে সরকারিভাবে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি জানিয়েছেন মা শামছুর নাহার ।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
Close