ধর্ম

মিছে এই জীবনের রংধনু সাতরং

এখনই সময় :

অর্থ-সম্পদ, ক্ষমতা, সম্মান, প্রভাব-প্রতিপত্তি মানুষের জন্য এত বেশি লোভনীয় করা হয়েছে যে বেশির ভাগ মানুষ এগুলোর প্রেমে পড়ে আল্লাহ ও পরকাল ভুলে যায়। অথচ পার্থিব জীবনের এসব চাকচিক্য ক্ষণস্থায়ী। একদিন এগুলোর কোনো কিছুরই অস্তিত্ব থাকবে না। এগুলো পরীক্ষাস্বরূপ। তিনি দেখতে চান এসব নিয়ামত কে সঠিক পথে ব্যবহার করে, আর কে তার অপব্যবহার করে। মহান আল্লাহ দেখতে চান, মানুষের মধ্যে কে তার আমল ও কর্মে শ্রেষ্ঠ। অর্থাৎশ্রেষ্ঠতম কাজ বা উত্তম আমল দেখার জন্যই মহান আল্লাহ মানুষের জন্য সুন্দর এ পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন।

পবিত্র কোরআনের মোট চারটি আয়াতে এ বক্তব্য ধ্বনিত হয়েছে—

এক. ‘তিনি (আল্লাহ) সেই সত্তা, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। আর তাঁর আরশ ছিল পানির ওপর, যেন তিনি যাচাই করতে পারেন, তোমাদের মধ্যে কে কর্মে শ্রেষ্ঠ…।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৭) দুই. ‘যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আমি তো তার শ্রমফল নষ্ট করি না যে ব্যক্তি উত্তমরূপে আমল করে।’ (সুরা : কাহফ, আয়াত : ৩০)

তিন. ‘তিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য—কে তোমাদের মধ্যে কর্মে উত্তম? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।’ (সুরা : মুলক, আয়াত : ২)

চার. ‘পৃথিবীতে যা কিছু আছে, আমি তা তার জন্য শোভা বানিয়েছি, যেন আমি পরীক্ষা করতে পারি মানুষের মধ্যে আমলে কে শ্রেষ্ঠ। পৃথিবীর ওপর যা কিছু বিদ্যমান, তা আমি অবশ্যই (একদিন) উদ্ভিদশূন্য ময়দানে পরিণত করব।’ (সুরা : কাহফ, আয়াত : ৭-৮)

এ আয়াতগুলোর দিকে গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, ‘মহান আল্লাহ মানুষকে বেশি বেশি নেক আমল করার জন্য সৃষ্টি করেছেন’—এমন কথা আয়াতগুলোতে বলা হয়নি। বরং উত্তম আমল বা শ্রেষ্ঠতম আমল করার জন্য মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এর জন্য শর্ত হলো—এক. প্রত্যেক কাজ একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে।

দুই. ওই আমল মহানবী (সা.)-এর নিয়ে আসা শরিয়ত মোতাবেক হতে হবে। এই দুই শর্তের কোনো এক শর্ত লঙ্ঘন করে যত আমল করা হোক না কেন, আল্লাহর কাছে তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই।

তাই আমল ও ইবাদত অধিক পরিমাণ করার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তা বিশুদ্ধ পদ্ধতিতে হওয়া এবং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা।

দুনিয়ার জীবন দেখতে খুবই সুন্দর। নিসর্গপ্রেমী সে সৌন্দর্য হৃদয় দিয়ে তা অবলোকন করে। এ দৃশ্য তার মন অনাবিল আনন্দে ভরে দেয়। ফলে সে এ জীবনের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। সে মনে করে, সে নিজেই এ জীবনের মালিক! হঠাৎআকস্মিকভাবে সুন্দর জীবন তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। তৈরি করা হয় তার ও জীবনের মাঝে সুবিশাল অভেদ্য প্রাচীর। তখন তার হতভম্ব হয়ে চোখ উল্টিয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন দুনিয়ার এ জীবনকে জমিনের সঙ্গে তুলনা করেন।

ইরশাদ হয়েছে, ‘পার্থিব জীবনের দৃষ্টান্ত বৃষ্টির মতো, যা আমি আকাশ থেকে বর্ষণ করি, অতঃপর তা দিয়ে জমিনের উদ্ভিদ উৎপন্ন হয়, আর মানুষ ও জীবজন্তু তা আহার করে থাকে। তারপর ভূমি যখন শোভা ধারণ করে ও নয়নাভিরাম হয় এবং এর (জমিনের) মালিকরা মনে করে এসব তাদের আয়ত্তাধীন, তখন রাতে বা দিনে আমার নির্দেশ এসে পড়ে। তারপর আমি তা এমনভাবে নির্মূল করে দিই, যেন গতকালও তার অস্তিত্ব ছিল না…।’ (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ২৪)

জমিনে যখন বৃষ্টি পড়ে তখন এ বৃষ্টির পানি বীজের সঙ্গে মিশে খুব সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন ফসল উৎপন্ন হয়। ফসলের অপরূপ সৌন্দর্য একজন দর্শকের দৃষ্টিকে ভরে দেয় অনাবিল আনন্দে। তখন সে ধোঁকার বশবর্তী হয়ে ধারণা করে যে সে নিজেই ফসল উৎপাদন করতে সক্ষম এবং এ ফসলের সে নিজেই প্রকৃত মালিক ও নিয়ন্ত্রক। হঠাৎকরে আল্লাহর নির্দেশ এসে যায়। আক্রান্ত হয় জমিনের ফসল। তখন তার ধারণা ও বিশ্বাস একেবারেই ভ্রান্তিতে পর্যবসিত হয়, তার হাত একেবারে খালি হয়ে যায়। অনুরূপ দুনিয়ার জীবনের অবস্থা এবং যারা দুনিয়ার জীবন আঁকড়ে ধরে তাদের পরিণতি। এ দৃষ্টান্ত আল্লাহর দেওয়া। এটি দুনিয়ার জীবনের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত।

এখানে যে উপমা ব্যবহার করে দুনিয়ার অস্থায়িত্ব বোঝানো হয়েছে, পবিত্র কোরআনে এ বিষয়ে আরো কয়েকটি আয়াত আছে। এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘জেনে রেখো, দুনিয়ার জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারস্পরিক গর্ববোধ, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এর উপমা হলো বৃষ্টি, যা দিয়ে উৎপন্ন শস্যসম্ভার কৃষকদের মুগ্ধ করে। তারপর তা শুকিয়ে যায়। ফলে তুমি তা হলুদ রঙের (ফ্যাকাশে) দেখতে পাও। অবশেষে তা খড়কুটায় পরিণত হয়।’ (সুরা : হাদিদ, আয়াত : ২০)

অন্য আয়াতে এসেছে : ‘তাদের কাছে দুনিয়ার জীবনের উপমা তুলে ধরো, এটা পানির মতো, যা আমি বর্ষণ করি আকাশ থেকে। এর মাধ্যমে জমিনের ফসল উৎপন্ন হয়। তারপর তা শুকিয়ে যায়। বাতাস তা উড়িয়ে নিয়ে যায়। আল্লাহ সব বিষয়ে ক্ষমতাবান।’ (সুরা : কাহাফ, আয়াত : ৪৫)

আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনের পরিব্যাপ্তি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘যেদিন তারা তা (কিয়ামত) প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন তাদের মনে হবে পৃথিবীতে তারা যেন মাত্র এক সন্ধ্যা বা এক সকাল অবস্থান করেছিল।’ (সুরা : নাজিআত, আয়াত : ৪৬)

অন্য আয়াতে এসেছে : ‘আল্লাহ বলবেন, তোমরা দুনিয়ায় কত বছর অবস্থান করেছিলে? তারা বলবে, আমরা অবস্থান করেছিলাম এক দিন বা দিনের কিছু অংশ।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ১১৩)

দুনিয়ার জীবনের ভোগ-বিলাস, আহার-বিহার, আনন্দ-বিনোদনকেই এক শ্রেণির মানুষ মুখ্য ও জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য জ্ঞান করে। জীবনকে ভালোভাবে উপভোগ করার জন্য তারা মদ, নারী ও নেশায় মগ্ন হয়ে যায়। পরকালের শাস্তির ভয় না থাকায় তারা দুনিয়াতে বল্গাহীন জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে। স্রষ্টার অবাধ্যতায় যারপরনাই ধৃষ্টতা দেখায়। মৃত্যুকেই তারা জীবনের শেষ পরিণতি মনে করে। তারা মনে করে, মরে যাওয়া মানেই সব কিছু শেষ হয়ে যাওয়া। কিন্তু শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ কি শুধুই ভোগের জন্য এ দুনিয়ায় এসেছে? শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড ভোগ করা হলে জীবজন্তুই শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হওয়ার কথা। কেননা উট মানুষের চেয়ে বেশি খায়। মোরগ ও চড়ুই পাখি সর্বাধিক সহবাস করে। সিংহ ও বাঘ অনেক বেশি নৈরাজ্য ও ত্রাস সৃষ্টি করতে পারে। সাপ-বিচ্ছু অন্যকে অনেক বেশি কষ্ট দেয়। কিন্তু তাদের পাপ তো ধর্তব্য নয়। যেসব মানুষ জীব-জানোয়ারের মতো পাপ করে, তারা তো পাপের বোঝা বহন করে বেড়ায়। দুই চোখ বন্ধ হলেই তা বুঝে আসবে; তখন আফসোসের অন্ত থাকবে না। ইরশাদ হয়েছে, ‘পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক ছাড়া আর কিছুই নয়। আর যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য আখিরাতের আবাসই শ্রেয়; তোমরা কি অনুধাবন করো না?’ (সুরা আনআম, আয়াত : ৩১-৩২)

মহান আল্লাহ আমাদের অনুধাবন করার তাওফিক দান করুন।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
Close