ধর্ম

মুসলিম সভ্যতায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী

এখনই সময় :

ইসলামী রাষ্ট্রের বিকাশের সময় থেকে রাষ্ট্রের নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থাও গড়ে ওঠে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় অর্থ, বিচার ও আইন প্রয়োগে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। তবে ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা ও কার্যক্রম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমও বিস্তৃত হয় এবং শান্তি ও নিরাপত্তা মুসলিম শহরগুলোর মানুষের আস্থা অর্জন করে। মুসলিম সভ্যতার ইতিহাসে যা একটি সোনালি অধ্যায় রচনা করেছে।

শুরতা বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রধানত পুলিশ (চড়ষরপব) বলা হয়। ইংরেজি পুলিশ শব্দের আরবি প্রতিশব্দ ‘শুরতা’। আরব ইসলামী খেলাফত বা মুসলিম শাসনব্যবস্থায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাম শুরতা ছিল। তাই ইসলামের ইতিহাসে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিবরণ দিতে ‘শুরতা’ শব্দটিই ব্যবহার করেছেন ঐতিহাসিকরা। ‘শুরতা’ শব্দের অর্থ পতাকা বা চিহ্ন। যেহেতু পুলিশ বাহিনী রাষ্ট্রীয় প্রতীক ব্যবহার করার কারণে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা লাভ করে, তাই তাদের ‘শুরতা’ বলা হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানকে ‘সাহিবুশ-শুরতা’ বলা হতো। তবে উত্তর আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোয় তাদের ‘হাকিম’, স্পেনে ‘সাহিবুল মদিনা’ ও তুরস্কে (উসমানীয় খেলাফত) ‘ওয়ালি’ বলা হতো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানকে। (মুকাদ্দিমা ইবনে খালদুন, পৃষ্ঠা ২৫)

ইসলামী রাষ্ট্রে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা

আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর মনসুর (৭৫৪-৭৭৫ খ্রি.) ইসলামী সমাজে পুলিশের কাজ ও অবস্থান সম্পর্কে বলেন, ‘আমি আমার দরজায় চারজন পাহারাদার রাখার প্রয়োজন বোধ করি না। তবে আমি চার শ্রেণির মানুষ থেকে কখনো অমুখাপেক্ষী হতে পারি না। কেননা তারা রাষ্ট্রের স্তম্ভ। এক. বিচারক—যে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে কোনো সমালোচকের সমালোচনার ভ্রুক্ষেপ করে না, দুই. পুলিশ—যে সবলের বিরুদ্ধে দুর্বলকে সাহায্য করে, তিন. রাজস্ব কর্মকর্তা—যে রাজস্ব সংগ্রহ করে কিন্তু অধীনদের প্রতি জুলুম করে না, চার. সংবাদবাহক—যে ওপরের তিন শ্রেণির সংবাদ যথাযথভাবে পৌঁছে দেয়।’ (আল মুনতাজাম ফি তারিখিল মুলুকি ওয়াল উমাম : ৭/৩৪৭)

ইসলামী রাষ্ট্রে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মর্যাদা

ইসলামের ইতিহাসে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। তাদের সামাজিক অবস্থান ছিল অত্যন্ত উঁচু। রাষ্ট্র পরিচালনায়ও তাদের মতামতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। মিসরের শাসকদের দরবারে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মর্যাদা ছিল ঈর্ষণীয়। এই বাহিনীর প্রধান গভর্নরের অনুপস্থিতিতে নামাজের ইমামতি, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের চাবি সংরক্ষণসহ অন্যান্য দায়িত্ব পালন করতেন। মিসরের সামরিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর জন্য ‘শুরতাতুল উলয়া’ নামের সাংবিধানিক পদ ছিল। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান নিয়মিত পাঠদান করতেন সেখানে। মিসরের শাসক প্রতিদিন তাঁকে সাক্ষাৎ দিতেন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সফরে তাঁকে সঙ্গে রাখতেন। শাসকের পক্ষ থেকে তাঁকে ‘তাবারজিন’ নামের ‘সোর্ড অব অনার’ প্রদান করা হতো এবং তিনি তা সব সময় বহন করতেন। (আল-খাতাতুল মুকাররিজিয়্যা : ১/৮৪১; আল-হাদারাতুল ইসলামিয়া ফিল কারনির রাবি আল-হিজরি : ২/২৭৫)

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন পদ

আব্বাসীয় খলিফারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস করেন। তারা ‘শুরতা’ বাহিনীর ক্রমমর্যাদার ভিত্তিতে একাধিক পদ সৃষ্টি করেন। তা হলো—

ক. রায়িসুশ-শুরতা বা প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা;

খ. নায়িবুশ-শুরতা বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপপ্রধান;

গ. আসহাবুল আরবা—যাঁরা বাগদাদ নগরের চারটি প্রবেশপথের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা;

ঘ. কাতিবুশ-শুরতা—যিনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করতেন।

ঙ. সাহিবুস-সিজন বা কারা কর্মকর্তা।

চ. আশ-শুরতা—যাঁরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাধারণ সদস্য হিসেবে নিয়োগ পেতেন।

ছ. আত-তাওয়াবুন—যাঁরা গোপনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হয়ে কাজ করতেন এবং তাদের কাছে তথ্য পৌঁছে দিতেন। (বিস্তারিত দেখুন : আশ-শুরতাতু ফিল ইসলাম : মুনজু সাদরুল ইসলাম ইলা নিহায়াতিল আসরিল আব্বাসি, পৃষ্ঠা ৬৪-৬৯)

মুসলিম ইতিহাসের প্রথম আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী

পুলিশ বাহিনী আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ হলেও প্রাচীন পারস্য, রোম ও ইয়েমেনের মতো উন্নত সভ্যতা ও রাষ্ট্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্তিত্ব ছিল বলে ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়। ইসলামপূর্ব আরব উপদ্বীপে কোনো রাষ্ট্রীয় কাঠামো না থাকায় সেখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও অস্তিত্ব ছিল না। মহানবী (সা.) আরব উপদ্বীপে প্রথম আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গঠন করেন। মদিনার মুসলিমদের প্রতি মক্কার কুরাইশ ও তাদের মিত্রদের পক্ষ থেকে সৃষ্ট হুমকি এবং মদিনার উপকণ্ঠে বসবাসকারী মুসলিমদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক ‘টহল দল’ গঠন করা হয়। এসব বাহিনীতে তিন থেকে পঞ্চাশজন পর্যন্ত সদস্য অংশগ্রহণ করতেন। তাঁরা মদিনার উপকণ্ঠের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে টহল দিতেন। তাঁদের ‘হিরাসুর-রাসুল’ বলা হতো।

মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর নিজের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করলে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) অস্ত্র হাতে তাঁকে পাহারা দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসেন। তখন আনসারি সাহাবিরাও যেকোনো ধরনের হামলার ভয়ে নিজেদের প্রস্তুত রাখতেন। (আর রাহীকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা ২০২; নবীয়ে রহমত, পৃষ্ঠা ২১৯)

এ ছাড়া মহানবী (সা.) বিভিন্ন যুদ্ধে মুসলমানের নিরাপত্তা রক্ষায় বিভিন্ন জনকে নিয়োগ দেন। যেমন বদরের যুদ্ধে সাদ বিন উবাদা, উসাইদ বিন হুদাইর ও সাদ বিন মুয়াজ (রা.)-কে, উহুদ যুদ্ধে মুহাম্মদ বিন মাসলামা (রা.)-এর নেতৃত্বে ৫০ জন সাহাবিকে, খায়বারের যুদ্ধে ইবাদ বিন বকর, মুহাম্মদ বিন আবি ওয়াক্কাস ও আবু আইয়ুব আনাসারি (রা.)-কে এবং খন্দকের যুদ্ধে আবদুল্লাহ বিন জুবায়ের (রা.)-কে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে নিয়োগ দেন।

আবু বকর (রা.)-এর যুগে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী

ইসলামী খেলাফতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আবু বকর (রা.) প্রথম নিয়মিত বাহিনী গঠন করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা দমনের পর আবু বকর (রা.) ইসলাম প্রচার ও দেশ জয়ের ব্যাপারে মনোযোগী হন। তখন বিপুলসংখ্যক সাহাবি মদিনা থেকে দূরে চলে যান। ফলে মদিনার নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। তিনি এই শঙ্কা দূর করতে মদিনার প্রবেশমুখে পাহারা এবং রাতে মদিনার রাস্তায় রাত্রীকালীন টহলের ব্যবস্থা করেন। মসজিদে নববীতেও পূর্ণ প্রস্তুতিসহ একটি দল সব সময় অবস্থান করত। তাঁর যুগে মদিনার আইন-শৃঙ্খলার কাজে নিয়োজিত দলগুলোর নেতৃত্বে ছিলেন আলী ইবনে আবি তালিব, জুবায়ের ইবনুল আউয়াম, তালহা বিন উবাইদুল্লাহ, সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস, আবদুর রহমান ইবনুল আউফ, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) প্রমুখ। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৬/৫৫; তারিখে দামেস্ক : ২৫/১৫৯)

ওমর (রা.)-এর যুগে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী

ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) খলিফা মনোনীত হওয়ার পর আবু বকর (রা.) কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। তিনি মুসলিম নগরগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘নিজামুল আসাস’ (নৈশপ্রহরী) ও ‘হিরাসাতু তরিক’ (রাস্তার প্রহরী) বিভাগ খোলেন। মক্কা-মদিনা ছাড়াও তিনি মিসরসহ মুসলিম শাসনাধীন অন্যান্য অঞ্চলেও একই ব্যবস্থা চালু করেন। ওমর (রা.) নিজেও রাতের অন্ধকারে মদিনার পথে পথে ঘুরতেন এবং মানুষের অবস্থা জানার চেষ্টা করতেন। তাঁর সময় বাজার পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা হয়। এ সময় কুফা, বসরা, দামেস্ক ও ফুসতাত শহরের আধুনিক পুলিশ প্রশাসনের আদলে নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায় এবং তিনি মক্কার সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার বাড়ি কিনে তাতে কারাগার প্রতিষ্ঠা করেন। এটিই ছিল ইসলামের ইতিহাসে প্রথম কারাগার। (তারিখে তাবারি : ৪/২০৫; আখবারুল কুজাত : ২/১৮৮)

ওসমান (রা.)-এর যুগে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী

ওসমান ইবনে আফফান (রা.) পূর্ববর্তী খলিফাদের রেখে যাওয়া নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরো জোরালো করেন। তিনি ইসলামী খেলাফতের রাজস্ব, শাসন, বিচার ও আইন-শৃঙ্খলা বিভাগ পৃথক করেন এবং প্রথমবারের মতো পৃথক ‘সাহিবুশ-শুরতা’ বা নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিয়োগ দেন। প্রত্যেক প্রদেশের একজন করে ‘সাহিবুশ-শুরতা’ নিয়োগের নির্দেশ দেন তিনি। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান কুরাইশ বংশোদ্ভূত মুহাজির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)। তিনি মদিনার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান ছিলেন। খলিফা হিসেবেও তিনি প্রথম ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রহরী নিযুক্ত করেন। ওসমান (রা.)-এর যুগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজের পরিধিও বিস্তৃত হয়। তারা মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিরাপত্তা, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা রক্ষায়ও মনোযোগী হয়। (ফুতুহুল মিসর, পৃষ্ঠা ২৩৬; আসরুল খিলাফাতুর রাশিদা : ১/১৩৭)

আলী (রা.)-এর যুগে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী

ওসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর মুসলিম বিশ্বে নানাবিদ সংকট ও অস্থিরতা দেখা দেয়। ইসলামী খেলাফতের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। আলী (রা.) নাগরিকদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসনকে পূর্ণতা দেন। তিনি নিরাপত্তাকর্মীদের দিন ও রাতের শিফটে ভাগ করেন এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি করার বিধান জারি করেন। গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকারীদের জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। তাঁর সময় ছয় হাজার নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ পায় এবং গোলযোগপূর্ণ অঞ্চলে তাদের অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। তাঁর সময় নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারীদের মধ্যে রয়েছেন মা’কাল বিন কায়েস, মালিক হাবিব, কায়েস বিন সাদ প্রমুখ। (আল ইসলামু ওয়াল খিলাফা : আন নামাজুল ইসলামিয়া, পৃষ্ঠা ১৩৭; তারিখুল খলিফা, পৃষ্ঠা ২০০)

আলী (রা.) কারা প্রশাসনের প্রবক্তা। ইসলামের ইতিহাসে তিনি প্রথম কারা প্রশাসন গঠন করেন এবং কারাবন্দিদের জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে খাবার, চিকিৎসা ও পোশাক বরাদ্দ দেন। (আল খিরাজ, পৃষ্ঠা ৪৯-৫০)

উমাইয়া যুগে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী

মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান (রা.) খলিফা হওয়ার পর মুসলিম বিশ্বে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা আরো বেড়ে যায়। ফলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিধি ও সামর্থ্য দুটিই বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তিনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও কর্মকর্তা নিয়োগে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করেন। এমনকি তাঁর সময় কোনো কোনো প্রদেশের গভর্নর ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান একই ব্যক্তি ছিলেন। ১১০ হিজরিতে খালিদ বিন আবদুল্লাহ একই সঙ্গে বসরার গভর্নর ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান। উমাইয়া যুগে কারাগারের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। (তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক : ৪/১৩৬)

উমাইয়া খলিফারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নিয়োগে কিছু শর্ত যুক্ত করেন। যেন তারা পেশাগত জীবনে আরো বেশি যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারে। উমাইয়া খেলাফতের শীর্ষ কর্মকর্তা জিয়াদ ইবনে আবিহি বলতেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উচিত কঠোর মনোভাব, চৌকস, প্রাপ্তবয়স্ক, সুচরিত্র ও অভিযোগমুক্ত হওয়া।’ (তারিখুল ইয়াকুবি : ২/২৩৫)

আব্বাসীয় যুগে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী

উমাইয়া খলিফাদের প্রতিষ্ঠিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান ও নীতিমালার আধুনিকায়ন করেন আব্বাসীয় খলিফারা। তাঁরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দেন এবং রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার পাশাপাশি মানুষের ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ রক্ষায় গুরুত্বারোপ করেন। ফলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান নিয়োগে তাঁদের অন্যান্য যোগ্যতার পাশাপাশি ধর্মীয় জ্ঞানে পাণ্ডিত্য ও গভীরতা লক্ষ করা হতো। আব্বাসীয় আমলের নিরাপত্তা কর্মকর্তা ইবরাহিম ইবনে হুসাইন ইবনে খালিদ সম্পর্কে বলা হয়, ‘তিনি ছিলেন মর্যাদাবান, উত্তম চরিত্রের অধিকারী, ফকিহ (আইনজ্ঞ) ও তাফসিরশাস্ত্রে দক্ষ।’ তিনি প্রকাশ্যে অপরাধীদের দণ্ড প্রয়োগ করতেন। (তাবসিরাতুল হুক্কাম ফি উসুলিল আকদিয়াতি ওয়া মানাহিজিল আহকাম : ৫/৩১৯)

আব্বাসীয় শাসকরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আত্মরক্ষা, অস্ত্র পরিচালনা, ঘোড়া চালানোর প্রশিক্ষণ দেন। তাঁরাই প্রথম ‘দারুশ-শুরতা’ (পুলিশ স্টেশন) প্রতিষ্ঠা করেন এবং পুলিশের জন্য পোশাক হিসেবে কালো আবায়া নির্ধারণ করেন। (তারিখুর রুসুল ওয়াল মুলুক : ৮/৬৪১; প্রবন্ধ : মুহাম্মদ মুস্তফা হিলালি, আল-ফুতুহ ওয়াল ফুরুসিয়্যাতিল আরাবিয়্যা আল-ইসলামিয়্যা, আল-মাওরিদ, বর্ষ ১২, সংখ্যা ৪, পৃষ্ঠা ৩)

খলিফা হারুনুর রশিদের প্রধান বিচারক ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) আধুনিক কারাবিধি প্রণয়ন করেন এবং কারাগারে বন্দিদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির জন্য খলিফার কাছে সুপারিশ করেন। তাঁর সুপারিশের আলোকে খলিফা কারাগারের আধুনিকায়নের নির্দেশ দেন। (আল খিরাজ, পৃষ্ঠা ১৬১)

মুসলিম স্পেনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী

স্পেনে উমাইয়া শাসকরা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করেন। যার একাংশের নাম ছিল ‘আশ-শুরতাতুল কুবরা’ এবং অপরাংশের নাম ছিল ‘আশ-শুরতাতুল সুগরা’। প্রথম বিভাগের কাজ ছিল খলিফা ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই বাহিনীর প্রধান হিসেবে খলিফার ঘনিষ্ঠরাই নিয়োগ পেতেন। দরবারে তাঁর আসন খলিফার কাছাকাছি থাকত। আর দ্বিতীয় ভাগের কাজ ছিল সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। (আল-হাদরাতুল আরাবিয়াতুল ইসলামিয়া, পৃষ্ঠা ৩১৩-৩১৪)

ঐতিসাহিকদের ধারণা, ইউরোপীয় শাসকদের দ্বারা স্পেনের মুসলিম শাসকরা এই বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী গঠন করেন। স্পেনের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানকে মন্ত্রীর সমমর্যাদাসম্পন্ন মনে করা হতো। (মুকাদ্দিমা ইবনে খালদুন, পৃষ্ঠা ২৫)

ইসলামী রাষ্ট্রে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব

ইসলামী শরিয়তের বিধি-বিধান ও উল্লিখিত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে ইসলামী রাষ্ট্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকটি দায়িত্বের কথা স্পষ্ট হয়। তা হলো—

১. নাগরিকদের জীবন, সম্পদ ও সম্ভ্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

২. খলিফা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

৩. অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা।

৪. আইন প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করা।

৫. অপরাধীদের খুঁজে বের করে আইনের (আদালত) মুখোমুখি করা।

৬. অপরাধীদের ওপর শাস্তি প্রয়োগে আদালত ও কারা কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করা।

৭. প্রচলিত আইন সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা।

৮. অপরাধ তদন্ত করা।

৯. আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবস্থা শাসকদের কাছে তুলে ধরা এবং নতুন আইন প্রণয়নের সুপারিশ করা।

১০. প্রয়োজন ও সংকটের সময় সামরিক বাহিনীকে সহায়তা করা। (বিস্তারিত দেখুন : তাতাব্বুরু জিহাজিশ শুরতাতি ফি সাদরিল ইসলামি ওয়াল আহদিল উমাভি, পৃষ্ঠা ১০০-১০৮)

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যেভাবে নিয়োগ হতো

ইসলামী খেলাফতের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাধারণ সৈনিক ও কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিতেন শহরের প্রশাসক। তিনি তাদের নির্বাচন করতেন এবং তাদের প্রতি নির্দেশনা জারি করতেন। আর শহর প্রশাসক শহরের আইন-শৃঙ্খলার ব্যাপারে খলিফার কাছে জবাবদিহি করতেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর খলিফার গোয়েন্দা বাহিনী নজরদারি করত। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নিয়োগে নিম্নের গুণাবলি দেখা হতো—

১. গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব

২. সময়-সচেতনতা

৩. বিচক্ষণতা

৪. সাহসিকতা

৫. চারিত্রিক দৃঢ়তা

৬. ইসলামী খেলাফতের প্রতি আনুগত্য

৭. শারীরিক সুস্থতা, শক্তি ও সামর্থ্য

হাজ্জাজ বিন ইউসুফ আস-সাকাফিকে খলিফা মারওয়ান ইবনে আবদুল মালিক ইরাক ও আরব উপদ্বীপের ‘আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী’র প্রধান নিয়োগের দায়িত্ব দেন। তখন তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়, আপনি কেমন লোক চান? সে বলল, ‘ধৈর্যশীল, বিশ্বস্ত, চারিত্রিক দুর্বলতামুক্ত, ন্যায়পরায়ণ ও ক্ষমতাশীলদের দ্বারা প্রভাবিত নয়—এমন।’ তখন তাঁরা আবদুর রহমান ইবনে উবাইদ তামিমির নাম প্রস্তাব করেন।’ (উয়ুনুল আখবার : ১/১৭)

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর আরো দুটি বিশেষ বিভাগ

‘আল-হিসবাহ’ ছাড়াও মুসলিম শাসনামলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরো কয়েকটি বিশেষ বিভাগ ছিল। যেমন ‘ওলায়াতুল মাজালিম’ ও ‘আল-হাজিব’।

ওলায়াতুল মাজালিম : আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত হতো এই বিভাগ। যার ভূমিকা ছিল অনেকটা উচ্চ আদালতের মতো। তবে ‘ওলায়াতুল মাজালিম’ বিভাগের একই সঙ্গে বিচারিক ক্ষমতা ও আইন প্রয়োগের অধিকার ছিল। খলিফা বা সুলতান নিজে এই বিভাগে জনবল নিয়োগ দিতেন। যখন কোনো বিচারক কোনো সমস্যার সমাধানে অপারগতা প্রকাশ করতেন এবং প্রচলিত আইনে সত্য প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠা অসম্ভব হতো, তখন ‘ওলায়াতুল মাজালিম’ বিভাগের শরণাপন্ন হতেন। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংকট সমাধানের দায়িত্বও এ বিভাগের ওপর ন্যস্ত ছিল। আল্লামা ইবনে খালদুন এই বিভাগের পরিচয় তুলে ধরে বলেছেন, এটি একটি মিশ্র কাজ। অর্ধেক শাসকের এবং অর্ধেক বিচার বিভাগের। যার জন্য প্রয়োজন হয় উচ্চ ক্ষমতা ও সৎসাহসের—যেন দুই পক্ষকে অবিচার থেকে বিরত রাখা যায় এবং সীমা লঙ্ঘনকারীকে থেমে যেতে বাধ্য করা যায়। এটা তখনই প্রয়োজন হয়, যখন বিচারকরা ও অন্যরা বিষয়টি সমাধানে অপারগতা প্রকাশ করেন। তাঁর দৃষ্টি থাকবে দলিল-প্রমাণ, স্বীকারোক্তি, সূত্র ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর। সত্য প্রমাণিত হওয়া পর্যন্ত ওই ‘রায়’ বাস্তবায়ন স্থগিত রাখবেন এবং দুই পক্ষকে আপস রফার দিকে নিয়ে যাবেন। সাক্ষীদের শপথ গ্রহণ করাবেন। (সাধারণ) বিচারকের চেয়ে তাঁর দূরদর্শিতা থাকবে অনেক বেশি। (মুকাদ্দিমা, পৃষ্ঠা ১১৬)

হাজিব : হাজিব অর্থ অন্তরায় সৃষ্টিকারী। উমাইয়া ও আব্বাসীয় যুগে খলিফা ও শাসকদের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হলে তাঁরা ‘হাজিব’ নিয়োগ দেন। যারা মূলত দ্বাররক্ষীর কাজ করত এবং শাসকদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সাক্ষাতের অনুমোদন দিত। আল্লামা ইবনে খালদুন তাদের সম্পর্কে বলেন, ‘তাদের জন্য নির্ধারিত ঘর ও নির্ধারিত আসন ছিল। সেখানে বসে তারা সুলতানের নির্দেশ বাস্তবায়ন করত। তাদের একজন খলিফা ও তাদের মধ্যকার যোগাযোগ রক্ষা করত। সাক্ষাত্প্রার্থীদের সুলতানের কাছে নিয়ে যেত। এ জন্য তাদের ‘হাজিব’ বলা হতো।’ (মুকাদ্দিম, পৃষ্ঠা ১২৭)

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ বিভাগ ‘আল-হিসবাহ’

ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ বিভাগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘আল-হিসবাহ’ বিভাগ। এটি মূলত ছিল জনসাধারণের দৈনন্দিন জীবনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়, যেমন—বাজারব্যবস্থা এবং তাদের নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বিষয়ে রাষ্ট্রের পর্যবেক্ষক দল। এদের ভূমিকা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ‘ভ্রাম্যমাণ আদালতের’ অনুরূপ ছিল।

আল্লামা ইবনে খালদুন বলেন, ‘হিসবাহ সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধের অধ্যায়ভুক্ত এক দ্বিনি কর্তব্য, যা মুসলমানদের শাসকের জন্য আবশ্যক। তিনি যাঁকে এ কাজের যোগ্য মনে করবেন, তাঁকে নিয়োগ দেবেন, তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব নির্ধারণ করবেন এবং তা সম্পাদনের জন্য সাহায্যকারী গ্রহণ করবেন।’ (আল-মুকাদ্দিমা, পৃষ্ঠা, ২২৫)। হিজরতের পর মদিনায় ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন থেকে পরবর্তী মুসলিম শাসনব্যবস্থাগুলোয় হিসবাহভিত্তিক ভ্রাম্যমাণ আদালতের অসংখ্য প্রায়োগিক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, একদা মহানবী (সা.) খাদ্যশস্যের একটি স্তূপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি স্তূপের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিলেন, ফলে তাঁর হাতের আঙুলগুলো ভিজে গেল। তিনি বললেন, ‘হে খাদ্যের স্তূপের মালিক! একি ব্যাপার?’ লোকটি বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল, এতে বৃষ্টির পানি লেগেছে।’ তখন তিনি বললেন, ‘সেগুলো তুমি স্তূপের ওপরে রাখলে না কেন? যাতে লোকেরা দেখে নিতে পারত? জেনে রাখো, যে ব্যক্তি ধোঁকাবাজি করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৮০)

মহানবী (সা.) ওমর (রা.)-কে মদিনার বাজার তদারকির দায়িত্ব দেন। (নিজামুল হুকুমাতিন নাবুবিয়্যা আল-মুসাম্মা আত-তারাতিবুল ইদারিয়্যা : ১/২৮৭)

মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর খলিফারা হিসবাহ প্রয়োগের ব্যাপারে যত্নশীল ছিলেন। মহান চার খলিফার সময়কালে বিভিন্ন পদ্ধতিতে এ ব্যবস্থা কার্যকর করা হয় এবং এ ব্যবস্থার বিশেষ উন্নতিও হয় এই সময়। তারা নিজেরা বাজার, লোকালয়, মসজিদসহ রাজ্যের বিভিন্ন স্থান ঘুরে ঘুরে দেখতেন। চাবুক বা লাঠি নিয়ে বাজারে প্রবেশ করতেন, ব্যবসায়ীদের সব ধরনের প্রতারণা থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিতেন, সতর্ক করতেন এবং প্রতারণাকারী ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিকারীর ওপর শাস্তি প্রয়োগ করতেন। ওমর (রা.) ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় মুহতাসিব নিয়োগ দেন। যেমন—আবদুল্লাহ ইবনে উতবাহ (রা.) ও সোলায়মান ইবনে আবি খাসমাহ (রা.)-কে সামগ্রিক বিষয় অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেন। অন্যদিকে শিফা বিনতে আবদুল্লাহকে বাজারে মহিলাদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এবং সায়েব বিন জিয়াদকে মদিনার বাজার তদারকির জন্য নিয়োগ দেন। (তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক : ৫/৬৪; নিজামুল হিসবাহ : দিরাসাতুন ফিল ইদারাতিল ইকতিসাদিয়্যা লিল মুজতামা আল-আরাবি আল-ইসলামী, পৃষ্ঠা. ১২০)

খোলাফায়ে রাশিদুনের যুগে হিসবাহ প্রশাসনের কার্যক্রম প্রধানত বাজার তদারকিতে সীমিত ছিল। হিসবাহ পরিভাষাটি বোঝানোর জন্য এ সময় থেকে শুরু করে হিজরি প্রথম শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত ‘আমিল আলাস-সুক’ (বাজারে নিয়োজিত কর্মকর্তা) পরিভাষা ব্যবহৃত হতো। (আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা, পৃষ্ঠা ২৪৮)

একইভাবে উমাইয়া, আব্বাসীয় ও উসমানীয় খেলাফতের সময় আল-হিসবাহর প্রশাসনিক প্রয়োগ অব্যাহত ছিল। উসমানীয় শাসনামলে সামাজিক ও নৈতিক বিষয়ে ‘ইহতেশাব কানুননামা লারা’ নামের কমিটি হিসবাহ বিভাগ তদারকি করত। (রিদওয়ান, দিরাসাতুন ফিল হিসবাহ, পৃষ্ঠা ৪২)

ভারতবর্ষে মুসলিম শাসকরাও ‘আল-হিসবাহ’ বিভাগ চালু করেন। সুলতান নিজে ‘মুহতাসিব’ নিয়োগ দিতেন। তিনি জনসাধারণকে সব ধরনের অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখতে সচেষ্ট থাকতেন। (আশ শায়জারি, নিহায়াতুর রুতবাহ, পৃষ্ঠা ৮)

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
Close