ধর্ম

সন্তানের প্রতি মাতা-পিতার দায়িত্ব

এখনই সময় :

সন্তানের জন্য সবচেয়ে আপন হলো মাতা-পিতা। তদ্রূপ মাতা-পিতার জন্য সবচেয়ে আপন হলো সন্তান। সুসন্তান পার্থিক জীবনে সুখ-শান্তির এবং পরকালে মুক্তির অন্যতম মাধ্যম। মহানবী (সা.) বলেছেন, মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে তখন থেকে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তিনটি আমল অবশিষ্ট থাকে। (এ সবের পুণ্য সে মৃত্যুর পরেও প্রাপ্ত হবে।) ১. সদকায়ে জারিয়ার সাওয়াব, ২. মানবের উপকৃত জ্ঞানের পুণ্য এবং ৩. নেক সন্তানের দোয়া (মুসলিম, মিশকাত পৃষ্ঠা ৩২)। আল্লাহ আলুসি (রহ.) বলেছেন, ধনসম্পদ প্রাণরক্ষার মাধ্যম, আর সন্তান বংশরক্ষার মাধ্যম। সন্তান আল্লাহ তাআলার বিশেষ নেয়ামত। বৃদ্ধকালে সন্তানই হয় মাতা-পিতার আল্লাহ ছাড়া একমাত্র ভরসা।

সন্তানের প্রতি মাতা-পিতার দায়িত্ব : সন্তানের প্রতি মাতা-পিতার রয়েছে অসংখ্য দায়িত্ব ও কর্তব্য। যেমন—

একত্ববাদের বাণী শোনানো : সন্তান জন্মের পর প্রথম সুন্নাত কাজ হলো ডান কানে আজান এবং বাম কানে ইকামত দেওয়া। এর ফলে সন্তানের কানে সর্বপ্রথম একত্ববাদের বাণী পৌঁছে। হজরত আবু রাফে থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—আমি মহানবী (সা.)-কে দেখেছি, ফাতিমা (রা.)-এর গর্ভে হজরত হাসান (রা.) জন্মগ্রহণ করলে তিনি তাঁর কানে নামাজের আজানের মতো আজান দিয়েছেন। (তিরমিজি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৮৩)

মহানবী (সা.) বলেন, যখন তোমাদের সন্তানেরা কথা বলতে শেখে তখন তাদের কালেমা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু শিক্ষা দাও (বায়হাকি)।

অর্থবহ নাম রাখা : মানুষের ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটে নামের মাধ্যমে। দুনিয়ার এ নামেই পরকালে তাকে ডাকা হবে। এ নামের প্রভাব পড়ে বংশের মধ্যে। ফলে মাতা-পিতার কর্তব্য হলো তার সন্তানের একটি অর্থবহ নাম রাখা। মহানবী (সা.) অর্থবহ নয় এমন অনেক নাম পরিবর্তন করেছেন। যেমন—আবদুল ওজ্জা নাম পরিবর্তন করে রেখেছেন আবদুল্লাহ, আসিয়া নাম পরিবর্তন করে রেখেছেন, জামিলা, বুররা নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘জয়নব’। ইবনুল মুসাইয়্যিব (রহ.) বলেন, তাঁর পিতা একদা মহানবী (সা.)-এর দরবারে আসেন। রাসুল (সা.) তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার নাম কী? তিনি প্রত্যুত্তরে বলেন, ‘হাজন’ (শক্ত)। মহানবী (সা.) এ নাম পরিবর্তন করে সাহল (সহজ) রাখতে চাইলে তিনি বলেন, আমার পিতা আমার যে নাম রেখেছেন তা পরিবর্তন করব না। মুসাইয়্যিব (রহ.) বলেন, এর পর থেকে আমাদের পরিবারে সদা কঠিন অবস্থা ও পেরেশানি লেগে থাকত (সহিহ বুখারি, মিশকাত পৃষ্ঠা-৪০৯)।

উত্তম হলো আল্লাহর গুণবাচক নামের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে নাম রাখা। যেমন—আবদুল্লাহ, আবদুর রহমান ইত্যাদি। মহানবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহর কাছে তোমাদের সবচেয়ে প্রিয় নাম হলো আবদুল্লাহ ও আবদুর রহমান। বালিকাদের জন্য উত্তম হলো আমাতুল্লাহ, আমাতুর রহমান ইত্যাদি নাম রাখা।

আকিকা করা : শিশুর জন্মের সপ্তম দিন আকিকা করা সুন্নত। মহানবী (সা.) বলেন, প্রত্যেক শিশু তার আকিকার সঙ্গে বন্ধক থাকে। সুতরাং তার জন্মের সপ্তম দিন তার পক্ষ থেকে পশু জবেহ করবে, মাথার চুল মুণ্ডন করবে ও নাম রাখবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ছেলের জন্য দুটি ছাগল এবং মেয়ের জন্য একটি ছাগল আকিকা করবে (বায়হাকি)।

খতনা করানো : মাতা-পিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হক হলো পুত্রসন্তানের খতনার ব্যবস্থা করা। এটি সুন্নতে ইবরাহিমি। হজরত ইবরাহিম (আ.) বৃদ্ধ বয়সে নিজের খতনা নিজে করেছেন। মহানবী (সা.) বলেছেন, স্বভাবসম্মত কাজ পাঁচটি। তার মধ্যে একটি হলো খতনা।

যথাযথ প্রতিপালন : সন্তানকে যথাযথ প্রতিপালন করা মাতা-পিতার অপরিহার্য কর্তব্য। সন্তানের জীবনের নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা, রোগমুক্ত রাখা স্বাস্থ্যবান হিসেবে গড়ে তোলা এবং জীবনের উন্নতি ও বিকাশকল্পে যথাসাধ্য প্রচেষ্টা চালানো মাতা-পিতার কর্তব্য। তার পুষ্টিকর খাদ্য, বিশুদ্ধ পানিসহ প্রয়োজনীয় সব কিছুর ব্যবস্থা করা আবশ্যক। হজরত আনাস (রা.) বলেছেন—আল্লাহ আমার মাকে জাজায়ে খায়ের দান করুন। তিনি আমার লালন-পালন ও অভিভাবকত্বের দায়িত্ব পালন করেছেন। মহানবী (সা.) ইমাম হাসান-হোসাইনকে চুমু দিতেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, জনৈক গ্রামবাসী রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, আপনারা কি শিশুদের চুমু দেন, আমরা তো চুমু দিই না। মহানবী (সা.) তার কথা শুনে বলেন, আমার কী ক্ষমতা! যদি আল্লাহ তোমাদের অন্তর থেকে দয়া-মায়া উঠিয়ে নেন (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।

আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তারাই হবে দেশ ও জাতির কর্ণধার। তারা যদি হয় নম্র, ভদ্র, নীতিবান ও চরিত্রবান তবে গোটা সমাজই হবে নীতিবান ও চরিত্রবান। তাই ছোট সময়েই তাদের এভাবে গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে—কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ, পাকলে করে ঠাস ঠাস। অর্থাৎ ছোট সময় আদব-কায়দা ঠিক করতে না পারলে বড় হলে ঠিক করা যাবে না।

দ্বিনি শিক্ষা দান : মাতা-পিতার প্রধান দায়িত্ব হলো স্বীয় সন্তানকে দ্বিনি শিক্ষা দান করা। মহানবী (সা.) বলেছেন, প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর দ্বিনি জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। (ইবন মাজাহ, বায়হাকি, মিশকাত পৃষ্ঠা ৩৪) আল্লামা আবু হেলাল আসকারি বলেন, শিশুর জ্ঞান-বুদ্ধি হলে প্রথমে তার কাছে আল্লাহর পরিচয় দিতে হবে। তারপর অলংকার শাস্ত্র ও কোরআন শিক্ষা দিতে হবে। কোরআনের মাধ্যমে সে রাসুলকে চিনবে এবং রাসুলের মাধ্যমে আল্লাহকে চিনবে (কিতাবুস সানায়াতাইন)। পিতার অর্থ-সম্পদ ও মায়ের তত্ত্বাবধান উভয়ের মাধ্যমেই সন্তান হতে পারে সুশিক্ষিত ও আদর্শবান। ইমাম রাবিয়াতুর রায়ের মাতা স্বামীর রেখে যাওয়া ৮০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করে স্বীয় পুত্রকে যুগশ্রেষ্ঠ আলেম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। হজরত আবদুল কাদের জিলানি (রহ.)-এর মাতা স্বীয় পুত্রকে ৪০টি স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বাগদাদে প্রেরণের কাহিনি সর্বজনবিদিত।

শিষ্টাচার শিক্ষা দান : সন্তানকে নম্রতা, ভদ্রতা ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া মাতা-পিতার প্রধান দায়িত্ব। মহানবী (সা.) বলেছেন, পিতা স্বীয় সন্তানকে শিষ্টাচার অপেক্ষা উত্তম কিছু শিক্ষা দিতে পারে না। (তিরমিজি, মিশকাত পৃষ্ঠা-৪২৩)। বড়দের শ্রদ্ধা এবং ছোটদের স্নেহ করার প্রশিক্ষণ দিতে হবে মাতা-পিতাকেই। মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমার প্রকৃত উম্মত নয়। (তিরমিজি, মিশকাত পৃষ্ঠা-৪২৩)। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো ইরশাদ করেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের সঙ্গে স্নেহপূর্ণ ব্যবহার করো এবং তাদের আচার ব্যবহার সুন্দর করো। (তারগিব ও তারহিব)

মাতা-পিতাকে নিজেদের আচার ব্যবহার, চাল-চলন, কথা-বার্তা ইত্যাদির প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। কারণ, শিশুর জন্য মাতৃক্রোড় পাঠশালাতুল্য। সে মাতা-পিতার অনেক কিছু অনুকরণ ও অনুসরণ করে। সন্তানের সঙ্গে রাগ করা, চেঁচামেচি করা, গালমন্দ করা ইত্যাদি বৈধ নয়। মহানবী (সা.) বালক আবদুল্লাহর সঙ্গে খানা খাওয়ার সময় শিক্ষা দিয়েছেন, হে বালক! বিসমিল্লাহ পড়ো, কাছের থেকে খাও এবং ডান হাতে খাও।

ইবাদতে অভ্যস্ত করা : মাতা-পিতার অন্যতম দায়িত্ব হলো সন্তানকে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নামাজ, রোজা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, তাসবিহ-তাহলিল ইত্যাদি ইবাদতে অভ্যস্ত করা। তাছাড়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, অপরকে সালাম দেওয়া এবং সুন্নত তরিকা মোতাবেক চলার প্রশিক্ষণ দেওয়া। মহানবী (সা.) বলেছেন, যখন তোমাদের সন্তানের বয়স সাত বছর হয়, তখন নামাজ পড়ার তাগিদ দাও এবং যখন ১০ বছর বয়সে উপনীত হয় তখন নামাজ পড়ার জন্য শাসন করো। আর তখন তাদের বিছানা পৃথক করে দাও। (আবু দাউদ, মিশকাত পৃষ্ঠা-৫৮)।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘নিজের পরিবার-পরিজনকে নামাজের আদেশ দাও এবং তাতে অবিচলিত থাকো…।’ (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ১৩২)

সন্তানের জন্য দোয়া : সন্তানকে আদব-কায়দা ও সুশিক্ষা দিলেই যথেষ্ট হবে না, তাদের জন্য মহান প্রভুর দরবারে দোয়াও করতে হবে। অনুরূপ সন্তান লাভের জন্য দোয়া করতে হবে। জাকারিয়া (আ.) এভাবে দোয়া করেছেন, ‘…হে আমার রব! আপনি আপনার পক্ষ থেকে আমাকে সৎ বংশধর দান করুন, অবশ্যই আপনি দোয়া শ্রবণকারী।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৩৮)

বিয়ের ব্যবস্থা করা : সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হলে তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করা মাতা-পিতার অন্যতম দায়িত্ব। মহানবী (সা.) তিনটি কাজ দ্রুত করতে বলেছেন—১. ওয়াক্ত হলে নামাজ পড়া, ২. ছেলে-মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হলে বিয়ের ব্যবস্থা করা, ৩. জানাজা উপস্থিত হলে জানাজা পড়া। (তিরমিজি ও মিশকাত)

মহান আল্লাহ আমাদের আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : প্রধান ফকিহ, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
Close