সারাদেশ

সর্বনাশা পদ্মা গিলল কনেসহ ৬ প্রাণ, এখনো নিখোঁজ ৩

এখনই সময় :

রাজশাহীতে পদ্মানদীতে ইঞ্জিনচালিত দুটি নৌকাডুবির ঘটনায় আজ শনিবার বিকেল পর্যন্ত ছয় জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখনও নববধূসহ নিখোঁজ রয়েছেন তিন জন। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় বরপক্ষের বাড়ি থেকে ফেরার পথে নগরীর শ্রীরামপুরের বিপরীতে নৌকাডুবে এ ঘটনা ঘটে। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান অব্যাহত ছিল।

একটি নৌকায় ছিলেন নিখোঁজ কনের মামাতো বোন তারিকা খাতুন (১৮)। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) পদ্মার ওপারে পবা উপজেলার চরখিদিরপুর গ্রামের রুমন আলীর (২৬) সঙ্গে এপারের ডাঙেরহাট গ্রামের সুইটি খাতুনের (২০) বিয়ে হয়। বিয়ের পর সুইটি শ্বশুর বাড়িতে ছিলেন। পরেরদিন শুক্রবার কনেপক্ষ বরের বাড়ি থেকে নবদম্পতিকে আনতে যায়। অনুষ্ঠান শেষে নবদম্পতিকে সঙ্গে নিয়ে কনেপক্ষ সন্ধ্যার কিছু সময় আগে বাড়ি থেকে বের হয়ে দুটি নৌকা করে রওনা দেন। পদ্মায় দুটি নৌকার মাঝের দূরত্ব ছিলো প্রায় এক কিলোমিটার। তাদের নৌকায় বর-কনেসহ অন্তত ২৮ জন ছিলেন। নদীতে প্রচণ্ড বাতাস ছিল। আকাশে ছিল কালো মেঘ। হঠাৎ নৌকায় পানি উঠতে শুরু করে। তখন পুরুষেরা নৌকা থেকে নেমে নৌকা ধরেই নদীতে সাঁতার কাটছিলেন। তারা ভেবেছিলেন নৌকা থেকে নেমে গেলে নৌকাটি ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা পাবে। কিন্তু ৭-৮ জন পুরুষ নৌকার চারপাশ ধরে সাঁতার কাটার সময়ই নৌকাটি ডুবে যায়। এরই মধ্যে একটি বালু বহনকারী ট্রলার সেদিকে গিয়ে তাদের রশি দিয়ে টেনে ট্রলারে তোলে। দ্বিতীয় নৌকায় ছিলেন কনের মামা মাসুদ রানা (৩৫)।

তিনি জানান, তাদের নৌকায় ২২-২৩ জন ছিলেন। মাঝপদ্মায় তাদের নৌকার ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। তারপর হঠাৎ নৌকার তলা ফেটে পানি উঠতে শুরু করে। পরে ওই নৌকাটিও ডুবে যায়। ওই সময় সামান্য দূরে থাকা একটি ছোট নৌকা দুজন ছাড়া বাকি সবাইকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।

এদিকে, শনিবার (৭ মার্চ) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে দ্বিতীয় দফায় উদ্ধার অভিযান শুরু করে চারটি উদ্ধারকারী ইউনিট। এর মধ্যে রাজশাহী সদর ফয়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একটি রংপুর থেকে আসা একটি, বিআইডব্লিউটির একটি এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) একটি ইউনিট কাজ করে।

বিজিবি-১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়া উদ্দিন মাহমুদ জানান, শুক্রবার রাত থেকেই বিজিবি সদস্যরা নিখোঁজদের উদ্ধারে ঘটনাস্থল থেকে শুরু করে রাজশাহী চারঘাট সীমান্ত পর্যন্ত স্পিডবোট নিয়ে টহল পরিচালনা করে।

রাজশাহী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদর দপ্তরের উপ-পরিচালক আবদুর রশীদ জানান, শনিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে আবারও উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। রাজশাহী, রংপুর ও বিআইডব্লিউটির তিনটি ইউনিট এবং বিজিবির একটি ইউনিট যৌথভাবে পদ্মায় উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। সকালে উজানের ৫০০ মিটার গভীরে অনুসন্ধান চালান হয়। দুপুরে ভাটির ৫০০ মিটারে অনুসন্ধান চালান হয়েছে। তবে নিখোঁজদের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

তিনি আরো বলেন, মানুষ পানিতে ডুবলে সাধারণত ৩৬ ঘণ্টা পর ভেসে উঠতে শুরু করে। এজন্য নৌ পুলিশ, মহানগর পুলিশ, জেলা পুলিশ এবং বিজিবি সদস্যরা রাজশাহীর শ্রীরামপুর এলাকা থেকে শুরু করে পদ্মাপাড় ঘেঁষে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে থাকা চারঘাট উপজেলা পর্যন্ত নিখোঁজদের খোঁজে টহল দিচ্ছেন।

শনিবার (৭ মার্চ) দুপুর আড়াইটার দিকে শ্রীরামপুরের বিপরীতে নৌকাডুবির ঘটনাস্থলের খুব কাছাকাছি স্থান থেকে রতন আলী (৩২) নামে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি নিখোঁজ নববধূ সুইটি খাতুন পূর্ণির দুলাভাই। দুপুর দেড়টার দিকে একই স্থান থেকে এখলাস হোসেন (২২) নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় জেলেরা। সে উপজেলার কাঁঠালবাড়িয়া গ্রামের আসলাম আলীর ছেলে। বিকেলের দিকে সুইটির চাচা মো. শামীম (৩১) ও তার মেয়ে রশনিকে (৮) উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া শনিবার ভোরে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৩৬ কিলোমিটার দূরে জেলার চারঘাট উপজেলার ইউসুফপুর সীমান্ত থেকে সুইটির ফুপু মনি বেগম (৪২) এবং শুক্রবার সন্ধ্যায় ঘটনার পরপরই মরিয়ম খাতুন (৮) নামে এক শিশুকে উদ্ধার করা হয়। শিশুটিকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও হাসপাতালে ভর্তি করার পর শিশুটিও মারা যায়। এখনও যারা নিখোঁজ তারা হলেন- কনে পূর্ণিমা, তার ফুফাতো বোন রুবাইয়া খাতুন (১৩) এবং খালা আখি খাতুন (২৫)।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের রাজশাহী সদর স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার আব্দুর রউফ জানান, এ পর্যন্ত ছয়টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আরো তিনজন নিখোঁজ রয়েছে। তবে তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। সবাইকে উদ্ধার না করা পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে।

এদিকে, নৌকাডুবির ঘটনা খতিয়ে দেখার জন্য সাত সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। কমিটিকে আগামী দুই কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কমিটিতে রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) আবু আসলামকে আহ্বায়ক করা হয়েছে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন- পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, বিআইডব্লিউটি, পুলিশ, নৌ-পুলিশের একজন করে প্রতিনিধি।

শনিবার (৭ মার্চ) সকালে রাজশাহী জেলা প্রশাসক হামিদুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পেলে দুর্ঘটনার সঠিক কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। তারপর কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দুর্ঘটনায় নিহতদের স্বজনদের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এ ছাড়া আহতদের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা হচ্ছে।

 

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
Close