জাতীয়

বদলি হলেও দায়িত্ব ছাড়ছেন না তিনি

শাহ আলম : প্রায় এক মাস আগে সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধক আমিনুল ইসলামকে বদলি করে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক করা হয়। কিন্তু এতদিনেও তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেননি। উল্টো নানা জায়গায় তদবির করে বদলি ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। আর যাকে সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাকে যোগদানে বাধা সৃষ্টি করছেন। এ অবস্থায় সমবায় অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, সমবায় অধিদপ্তরে তিনি মজা পেয়ে গেছেন। এ জন্য যেতে চাইছেন না। বদলি ঠেকানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন।

সম্প্রতি আমিনুল ইসলামের নানা অপকর্মের ফিরিস্তি তুলে ধরে সমবায় অধিদপ্তরের ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বরাবর একটি লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন। ওই অভিযোগপত্রে তার বিরুদ্ধে বদলিবাণিজ্য, উৎকোচ গ্রহণ, নিয়ম লঙ্ঘন করে একাধিক গাড়ি ব্যবহার, সমবায় অধিদপ্তরের গাড়ি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাকে ও পরিবারের সদস্যদের ব্যবহারের সুযোগ, নিয়োগবাণিজ্য, বড় বড় সমবায় সমিতির কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সুবিধা গ্রহণ, অসাধু কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি প্রদান প্রভৃতি অভিযোগ উঠে এসেছে। অবশ্য এসব অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো কথা বলতে নারাজ। সমকালকে তিনি বলেন, ‘সরকার যেহেতু বদলির আদেশ দিয়েছে, সেটা চাকরি করতে গেলে তো মানতেই হবে। কিন্তু যাকে এই পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তিনি আমার কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নিতে আসেননি। তাকে যোগদানে বাধা দেওয়ার ঘটনাও ঠিক নয়। সপ্তাহখানেকের মধ্যেই দায়িত্ব ছেড়ে দেব।’ অবশ্য এ প্রসঙ্গে নিবন্ধকের দায়িত্ব পাওয়া আকরাম হোসেন সমকালের কাছে যোগদানে বিলম্ব করার কারণ সম্পর্কে কিছু বলতে চাননি। জানা গেছে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি সরকারের অতিরিক্ত সচিব ও সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধক আমিনুল ইসলামকে বদলি করে বিএফডিসির এমডি করা হয়। নিবন্ধক পদে দায়িত্ব দেওয়া হয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আকরাম হোসেনকে। ওই আদেশ হওয়ার পরই আমিনুল ইসলাম বদলি ঠেকাতে উঠেপড়ে লাগেন। স্ত্রীকে নিয়ে সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্যের বাসায়ও যান। কিন্তু প্রতিমন্ত্রী তাতে সায় দেননি। এরপর তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দ্বারস্থ হচ্ছেন এবং সমবায় অধিদপ্তরে বলে বেড়াচ্ছেন তার বদলি আদেশ শিগগির বাতিল হয়ে যাবে। সে ব্যবস্থাও প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছেন। এখন শুধু আদেশ জারির অপেক্ষায়। এসব কথা বলে নিবন্ধকের দায়িত্ব পাওয়া আকরাম হোসেনকেও দায়িত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছেন না। এ অবস্থায় সমবায় অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও অস্বস্তি বিরাজ করছে। এদিকে তার বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া অভিযোগে ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উল্লেখ করেন, সাত মাস আগে নিবন্ধক হিসেবে যোগদানের পর কয়েকজন উপজেলা সমবায় কর্মকর্তাকে বদলি করেন আমিনুল ইসলাম। বিনিময়ে তিনি সম্মানী গ্রহণ করেন। এরপর বদলি বাণিজ্যে নেমে পড়েন। কিছুদিন পরই একসঙ্গে ৫০ উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা, পরিদর্শক, সহকারী পরিদর্শক, উচ্চমান সহকারী, অফিস সহকারীকে তাদের প্রত্যাশিত কর্মস্থলে বদলি করে প্রত্যেকের কাছ থেকে উৎকোচ নেন। সাবেক জেলা সমবায় কর্মকর্তা নিয়ামুল বাশারকে একদিন তার বাসায় ডেকে নিয়ে তার কাছ থেকে সম্মানী নেন। কিছুদিন আগে ভারত সফরে যাওয়ার সময় আবারও নিয়ামুল বাশারকে এক হাজার ডলার দিতে বলেন। নিয়ামুল বাশার তাকে ৫০০ ডলার দিয়ে রেহাই পান। কিছুদিন আগে তার মেয়ের বিয়েতে একটি কো-অপারেটিভ ইউনিয়নের কর্তাব্যক্তিদের কাছ থেকে মেয়ের বিয়ের খরচ বাবদ ১০ লাখ টাকা নেন। এ ছাড়া কিংশুক বহুমুখী সমবায় সমিতির একটি মামলায় অনৈতিক রায় দিয়েও সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ আছে অভিযোগপত্রে। আদালতের আদেশের পর সিভিডিপি প্রকল্পের ৩৭ কর্মচারীকে নিয়োগ দিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে এক লাখ টাকা করে আদায় করেন তিনি। নাহিদ নামে আমিনুল ইসলামের এক ভাগিনা সব সময় সমবায় অধিদপ্তরে তার কক্ষের সামনে বসে থাকে। সে সমবায় অধিদপ্তরের কেউ নয়। তার মাধ্যমেই এসব বাণিজ্যের টাকা আদায় করা হয়। সরকারের তরফ থেকে উপসচিব ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তার গাড়ি দেওয়ার সুযোগ নিয়ে ৩০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল আমিনুল ইসলামকে গাড়ি কেনার জন্য। পাশাপাশি মাসে ৫০ হাজার টাকা গাড়ির জ্বালানি খরচ। তিনি সেই গাড়িটি ছাড়াও অফিসের আরেকটি গাড়ি ব্যবহার করেন। এ ছাড়া তার স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েদের সার্বক্ষণিক ব্যবহারের জন্য সমবায় অধিদপ্তরের শাটল সার্ভিসের একটি গাড়ি দিয়ে রেখেছেন। পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের অতিরিক্ত সচিব নাসরিন আক্তার চৌধুরীকে সমবায় অধিদপ্তরের আরেকটি গাড়ি অলিখিতভাবে দিয়ে রেখেছেন আমিনুল ইসলাম। আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে চারিত্রিক স্খলনের অভিযোগ উঠলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়, বাইরে রাতযাপন করলে অবশ্যই তার স্ত্রীকে সঙ্গে রাখতে হবে। তারপরও তিনি সেটা ঠিকমতো অনুসরণ করেন না। এ ছাড়া আরও অনেক অভিযোগও রয়েছে ওই অভিযোগপত্রে।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
Close