মুক্তমত

মুজিববর্ষে বিদ্যমান আইনেই ধর্ষণ মামলার বিচার ও শাস্তি

এখনই সময়:

ধর্ষককে ‘এনকাউন্টার’ বা ‘ক্রসফায়ার’ নয়, বিদ্যমান আইনে বিচার করার ব্যবস্থা করতে হবে। ‘এনকাউন্টার’ বা ‘ক্রসফায়ার’ ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী আইনি সমাধান কোনোকালে বা যুগে সভ্য দেশে ও সমাজে ছিল না এবং বর্তমানেও হতে পারে না। একটি অন্যায় আরেকটি গুরুতর বেআইনি কাজ দিয়ে সমাধানের চেষ্টা বিচারের নামে অবিচার ছাড়া আর কিছু না। ক্রসফায়ার সুস্পষ্টভাবে মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘন। তাই বিচার বিভাগকে দ্রুতবিচার নিশ্চিতে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। ক্ষমতাসীন সরকার আইনের শাসনে বিশ্বাসী বলেই অনেক ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দ্রুত বিচার দেশবাসী ইতিমধ্যে প্রত্যক্ষ করেছে। যা বিচার বিভাগ তথা সমগ্র জাতির জন্য ইতিবাচক। তবে সাম্প্রতিককালে ভয়াবহ রকম হারে ধর্ষণের ঘটনা দ্বিগুণ হতে তিন চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যা সত্যিই দেশের জন্য অশুভ ও অশনিসংকেত।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সলিশ কেন্দ্র (আসক) এর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে এক হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন৷ ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৩২ জন৷ অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে দ্বিগুণ যা ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি৷২০১৭ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮১৮ জন নারী৷ এদিকে ২০১৯ সালে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৬ জনকে৷ আর আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১০ জন নারী৷ নারীর প্রতি সহিংসতার অন্য চিত্রগুলোও ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক৷ ২০১৯ সালে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ২৫৮ জন নারী৷ ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৭০ জন৷ এটি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪১ শতাংশ বেশি। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের প্রতিবেদন মতে, ২০১৯ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৫০০ জন। (দৈনিক সমকাল ২৯ জানুয়ারি) যা ভাবলে মাথা খারাপ যেকোনো মানুষেরই হতে পারে।

নারীর প্রতি সহিংসতা, ইভটিজিং, যৌন হয়রানি, নির্যাতন এবং ধর্ষণ সামাজিক ব্যাধি। সাম্প্রতিককালে যৌন হয়রানি, নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। যা সত্যিই দেশের জন্য অশুভ বার্তা বহন করে। এখনই ধর্ষণের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও তাদের ভাগ্য নির্ধারণ হবে আতঙ্কিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যা সভ্য সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে কোনোদিনই কাম্য নয়। বাসে, রাস্তাঘাটে, স্কুল-কলেজে, চাকরিতে এমনকি নিজের বাসা বাড়িতে পর্যন্ত বর্তমানে বাংলাদেশের মা-বোনেরা, মেয়েরা সর্বোপরি নারী জাতি সর্বত্র ধর্ষণ, যৌন হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বাসে যখন মেয়েরা বা মা-বোনরা চলাচল করে তখন বাসের হেলপার ও ড্রাইভার দ্বারা, স্কুল-কলেজে পরিমল ও ফেনীর সিরাজউদ্দৌলার মতো শিক্ষক দ্বারা, চাকরিতে নিজের অফিসের বস বা সহকর্মী দ্বারা, বাসা বাড়িতে গৃহকর্ত্রী ও তাদের সন্তানদের দ্বারা, নিজের বাসায় অনেক সময় দেবর বা শ্বশুরের মাধ্যমে যৌন হয়রানি হয়। রাজনৈতিক দলে ও মাঠে নারী কর্মীরাও যৌন হেনস্তা শিকার হন। আরও লক্ষণীয় যে, ইদানীং শিশুর প্রতি যৌন-সহিংসতা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে গেছে যা প্রতিরোধ জরুরি হয়ে পড়েছে। শিশু ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা প্রতিরোধ না করতে পারলে শিশু স্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।

২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌতুক দাবিতে মারপিট ও হত্যা, ধর্ষণ, ও যৌন হয়রানি বিচারের লক্ষ্যে প্রণীত হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৩ সালে ওই আইনকে যুগোপযোগী করে বিশেষ সংশোধনী আনা হয়। উক্ত আইনে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচারের ভার জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে দিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। দেশে যখন নতুন করে নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌতুক দাবিতে মারপিট ও হত্যা, ধর্ষণ বেড়ে যাচ্ছে তখন সরকার ২০১৮ সালে নতুন করে ৪১টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল বৃদ্ধি করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের মামলার পরিসংখ্যান হতে দেখা যায়, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ৯৫টি ট্রাইব্যুনালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীন প্রায় এক লাখ ৬৬ হাজার মামলার বিচারাধীন আছে। ওই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে প্রত্যেকটি ট্রাইব্যুনালে গড়ে ১৭৫০টির বেশি মামলা বিচারাধীন, যা একজন বিচারকের পক্ষে এই বিপুলসংখ্যক মামলার দ্রুত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভবপর নয়।

অতি সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত একজন ছাত্রী শিক্ষার্থীকে সন্ধ্যার পর ঢাকার বিমানবন্দর এলাকায় নির্মমভাবে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করায় দেশব্যাপী উক্ত ঘটনার বিচার দ্রুত নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু হয়। বিশেষ আদালত ও ট্রাইব্যুনাল গঠনের জন্য বিভিন্ন সংগঠন থেকে জোর দাবি জানানো হয়। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও শ্রীলংকার চেয়েও কার্যকর। ভারতে ধর্ষণের বিচার দণ্ডবিধি আইন অনুযায়ী স্বাভাবিক আদালতে বিচার হয়। যেখানে আমাদের দেশে বিশেষায়িত ট্রাইব্যুনালে বিচার হয়। সম্প্রতি ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট একটি মামলায় ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন ও শিশুদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের ক্ষেত্রে প্রতি ১০০টি মামলার জন্য বিশেষ আদালত গঠনের নির্দেশ প্রদান করেন।

ইতিমধ্যে পরিলক্ষিত হয়েছে দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ, ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা ছুটন্ত অশ্বের ন্যায় ধাবমান। পরপর উক্ত ঘটনায় জড়িত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিতে সব পেশা শ্রেণির মানুষ জেগে উঠেছে । ২০১৯ সালে ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ২০১৫- ২০১৮ সাল তথা বিগত চার বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পত্রপত্রিকার সংবাদ ও বিভিন্ন নারীবাদী সংগেঠনের জরিপ থেকে উঠে এসেছে, কন্যাশিশুদের ক্ষেত্রে ধর্ষণের ও যৌন নির্যাতনের হার অত্যাধিক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। বলা যায় শিশুরা যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে খুবই স্পর্শকাতর ও আতঙ্কিত অবস্থায় আছে।

বিদ্যমান আইন কী বলছে তা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (সংশোধনী২০০৩) এর ৯ ধারায় ধর্ষণ ও দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারায় ধর্ষণ’ এর সংজ্ঞায় উপস্থাপিত হয়েছে। ৯ ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোন পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ষোল বৎসরের অধিক বয়সের কোন নারীর সাথে তার সম্মতি ছাড়া বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তার সম্মতি আদায় করে, অথবা ষোল বৎসরের কম বয়সের কোন নারীর সাথে তার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করেছেন বলে গণ্য হবেন। দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারায় ধর্ষণ’ এর সংজ্ঞায় যে উপাদানের কথা বলা হয়েছে তা হলো- ১ম: মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে , ২য়: মেয়ের অনুমতি ছাড়া ৩য়: মৃত্যুভয়ে বা আঘাত দেওয়ার কারণে সম্মতি নিয়ে ৪র্থ: সম্মতিতে, যখন মেয়েটিকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ছেলেটি সম্মতি আদায় করে ছেলেটি জানে ভবিষ্যতে সে মেয়েটিকে স্ত্রী রূপে গ্রহণ করবে না ৫ম: তার সম্মতি বা সম্মতি ছাড়া, যখন ভিক্টিমের বয়স চৌদ্দ বছরের নিচে হয়।

ধর্ষণের শাস্তি: নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে। ধারা ৯(১): কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করবেন। এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডও তাকে দেয়া যেতে পারে। ধারা ৯(২): ধর্ষণের ফলে বা ধর্ষণের পড়ে অন্য কোন কাজের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলে ধর্ষণকারী মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করবেন। এছাড়াও তাকে এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। ধারা ৯(৩): একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করলে এবং ধর্ষণের কারণে উক্ত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলে তাহলে ধর্ষকরা প্রত্যেকেই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এছাড়াও তাদেরকে অন্যূন এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। ধারা ৯(৪): যদি কোন ব্যক্তি কোন নারী বা শিশুকে (ক) ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানোর বা আহত করার চেষ্টা করেন তাহলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন। (খ) যদি ধর্ষণের চেষ্টা করেন তাহলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক দশ বছর কিন্তু অন্যূন পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।

ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর নারীদের যা যা করণীয় তা এভাবে বর্ণনা করা যায়-যথা: ক. ধর্ষণের পর একা থাকবেন না, কোনো বান্ধবী বা আত্মীয়ার সাথে যোগায়োগ করুন, ঘটে যাওয়া ধর্ষণ নিয়ে কথা বলুন এবং তার সাহায্য নিন৷ খ. গোসল, খাওয়া-দাওয়া, ধূমপান, বাথরুম যাওয়া– সম্ভব হলে এসব বন্ধ রেখে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডাক্তারের কাছে চলে যান৷ অর্থাৎ ধর্ষণের চিহ্ন মুঝে যাবার আগেই ডাক্তারি পরীক্ষা করান৷ গ. হাসপাতালে যাওয়ার পর যদি ‘এমারজেন্সিতে’ কারো সাথে এ বিষয়ে কিছু বলতে না চান, তাহলে শুধু ‘আমাকে এক্ষুণি একজন স্ত্রী বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলতে হবে’– এ কথা বললেও চলবে৷ ঘ. ধর্ষণকারী যেসব জিনিসের সংস্পর্শে এসেছে, তার সব তুলে রাখুন৷ যেমন অন্তর্বাস, প্যাড ইত্যাদি৷ সম্ভব হলে এসব জিনিসের ছবিও তুলে রাখুন৷ ঙ. নিজেকে দোষী ভাববেন না৷ কারণ যে ধর্ষণের মতো জঘন্যতম কাজটি করেছে, শুধু সে একাই এর জন্য দায়ী, অপরাধী৷ আপনি নন৷

মামলা দায়েরসংক্রান্ত পরামর্শ বা উপদেশ যেমন: ধর্ষণের ঘটনা ঘটার পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনার নিকটবর্তী থানায় এজাহার বা অভিযোগ দায়ের করুন। পুলিশ কর্মকর্তার প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে চেষ্টা করুন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী ধর্ষণের মামলা বিশেষভাবে তদন্তের বিস্তারিত নিদের্শনা আছে। ওই আইনের ১৮ ধারা অনুযায়ী আসামি অপরাধ সংঘটনকালে পুলিশ কর্তৃক ধৃত বা অন্য কোনোভাবে ধৃত হলে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিলের নির্দেশনা আছে এবং যদি আসামি অপরাধ সংঘটনকালে ধৃত না হয়, সে ক্ষেত্রে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল করতে হবে। এছাড়া তদন্তের প্রয়োজনে তদন্ত কর্মকর্তার ট্রাইব্যুনালে ব্যাখ্যা প্রদানপূর্বক আরও অতিরিক্ত ৩০ কার্যদিবস সময় বৃদ্ধি করার সুযোগ আছে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তাকে পুলিশ প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে দাখিলের সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে। এছাড়া ২২ ধারা মোতাবেক ভিকটিমের জবানবন্দি গ্রহণের উদ্দেশ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ভিকটিমকে উপস্থাপনের নির্দেশনা আছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০-এর ২০ ধারা মোতাবেক বিশেষভাবে দ্রুতবিচার করার লক্ষ্যে শুধু ট্রাইব্যুনালে এই মামলার বিচার কার্যক্রম চলবে। ২০(২) উপধারা মোতাবেক ট্রাইব্যুনাল প্রতি কর্মদিবসে একটানা বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করে মামলা নিষ্পত্তির নির্দেশনা আছে। ২০(৩) উপধারা মোতাবেক ১৮০ দিনের মধ্যে বিচারকার্য সম্পাদন করার নির্দেশনা আছে। বিচারক অনুপাতে মামলার সংখ্যা বেশি হওয়ায় মাত্র ৯৫টি নারী শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল দিয়ে আইনে বেঁধে দেওয়া ১৮০ দিন সময়ের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া শেষ করা দুরূহ ব্যাপার। সঠিক সময় পুলিশ, ডাক্তার ও অন্যান্য সাক্ষী না আসা ও মামলার বিচার বিলম্বিত হওয়ার বড় কারণ।

শুধু ধর্ষণ মামলা নয় হত্যাসহ অন্যান্য বিচারের ক্ষেত্রে সাক্ষী ও প্রমাণ উপস্থাপন একটি অপরিহার্য বিষয়। বাংলাদেশে সাক্ষী দেওয়া অনেক ক্ষেত্রে বিপদ ও হুমকির কারণ হয়ে যায়। বিদ্যমান আইনে সাক্ষী সুরক্ষায় এবং সাক্ষী উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো আইন নেই। সাক্ষীদের সাক্ষ্য দেওয়ার পূর্বে ও পরে নিরাপত্তা বিধান এবং আদালতে তাদের উপযুক্ত ও সাবলীল পরিবেশ দিতে হবে, যেমনটা আছে ভারতসহ উন্নত দেশগুলোতে। মিথ্যা মামলা, মিথ্যা সাক্ষ্য, আদালতে জালিয়াতি প্রমাণিত হলে মিথ্যা মামলা দায়ের কারীকে অবশ্যই সাজা দিতে হবে । তদন্ত আর বিচারে অডিও, ভিডিও ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ আধুনিক সব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে অতি সত্বর। সকল অংশীজনসহ (স্টেকহোল্ডার) সকলের তথা তদন্তকারী, আইনজীবী, বিচারক, দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা থাকতে হবে। সেটি সম্ভব না হলে ক্রস ফায়ার ও মোবাইল কোর্টের মতো অবৈধ বিচার ব্যবস্থা জনপ্রিয়তা লাভ করবে তাতে অদূর ভবিষ্যতে জনগণই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ঢাকা বিশ্বকবদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ধর্ষণের পর আমরা কী দেখলাম? সংসদে আলোচনা হলো ধর্ষকদের ক্রসফায়ারে বা ‘এনকাউন্টারে’ হত্যা করা যেতে পারে। যেখানে আইন প্রণয়ন হয় সেখানেই এ ধরনের আলোচনা জাতিকে খুব বেশি আশ্বস্ত করেছে বলে মনে হয় না। ধর্ষকদের ‘ক্রসফায়ার’ করলে মৃত্যুর পর বেহেশতে যাওয়াও নিশ্চিত বলে আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে তরিকাও দেওয়া হয়েছে। (সমকাল, ১৫ জানুয়ারি ২০২০)। মোবাইল কোর্টে ইভটিজিং প্রতিরোধ সফল হয়েছে এরকম বক্তব্য আমরা দেশবাসী শুনেছি। তবে আশঙ্কার ব্যাপার হলো ইভটিজিংকারীদের অল্প মেয়াদে সাজা ও শুধু জরিমানা করে ছেড়ে দিয়ে যে ভুল হয়েছে তার মাশুল হলো শিশু ধর্ষণের এর মতো অনৈতিক ও সমাজবিরোধী কাজ যা আরো লাগামহীনভাবে ঘটে যাচ্ছে।

যেভাবে যৌন সহিংসতা এবং ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, সে ক্ষেত্রে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০-এর বাস্তব প্রয়োগের লক্ষ্যে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা অনুপাতে পর্যাপ্ত ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সুপ্রিম কোর্টের সমন্বয়ে বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করার মাধ্যমে রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষী উপস্থাপন ও যথাযথ সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে ইতিপূর্বে হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক কয়েকটি রায়ে নির্দেশনা দেওয়া আছে। সামগ্রিকভাবে দেখলে সহজেই অনুমেয় যে, ধর্ষণ মামলা ও অপরাধের বিচারের জন্য বিদ্যমান কার্যকর আইন থাকা সত্ত্বেও এর যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় নারীর প্রতি সহিংসতা, ইভটিজিং, যৌন হয়রানি, নির্যাতন এবং ধর্ষণ ইত্যাদি অপরাধের রাশ টেনে ধরা যাচ্ছে না।

অতীতে অনেক ঘটনা ধর্ষণ মামলার বিচার আলোর মুখ দেখেনি, দেখলেও অনেক সময় অপরাধীর শাস্তি হয়নি। ক্ষমতা ও অর্থের কাছে অনেক সময় ধর্ষণ হয়েছে এরুপ প্রমাণ করাও কঠিন হয়েছে ধর্ষিতার কাছে। ঘটনার পর দেন দরবার ও সালিশ হওয়ায় ভিকটিমের দেরিতে মেডিকেল পরীক্ষা এবং অনেক সময় পরিবারের অসচেতনতা ও আইন না জানার (যেমন ঘটনার পরে ভিকটিমকে গোসল করানো) কারণেও ধর্ষণের আলামত নষ্ট হয়। সুতরাং ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা ক্রসফায়ার দিলে বা বিধান করলেই যে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে এই অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল হবে, তা মোটাদাগে চোখ বন্ধ করে বলা কঠিন। কারণ যে সমাজ বাস্তবতা একজন লোককে ধর্ষক হতে উৎসাহ ও অনুপ্রাণিত করে, সেটির আশু পরিবর্তন করা না গেলে, মসজিদের ইমাম ও মন্দিরের পুরোহিত, পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত না হলে এবং নারীকে মানুষ হিসেবে সম্মান ও মর্যাদা দেয়ার শিক্ষা জোরালো করা না গেলে অধিকতর কঠোর থেকে কঠোরতর আইন করেও ধর্ষণের মতো অপরাধ থেকে দেশকে রক্ষা করা সত্যিই কঠিন হবে। তাই ধর্ষণের মত সামাজিক ব্যাধি দূর করতে সমাজের সব শ্রেণি পেশার মানুষকে সোচ্চার ও রুখে দেওয়ার শপথ নিতে হবে।

লেখক: বিচারক, বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
Close