স্পোর্টস

ভিক্ষা করে প্রতিবন্ধী দুই সন্তানকে লেখাপড়া শেখাচ্ছেন প্রতিবন্ধী বাবা

এখনই সময়:

ঠাকুরগাঁওয়ে একই পরিবারের তিনজন শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় দুর্বিসহ জীবন যাপন করছেন পরিবারটি। ছোঁয়াচে রোগ মনে করে গ্রামবাসীও তেমন দূরত্ব রেখে চলে তাদের সাথে। এ অবস্থাতে শরীরের অক্ষমতা নিয়ে জীবন সংগ্রামে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে কুঁড়েঘরে কোনোমতে মাথাগোঁজার ঠাঁই হলেও প্রতিবন্ধী দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত পথে যাত্রা প্রতিবন্ধী পিতা মাইনুদ্দীনের। সরকারিভাবে সামান্য সহযোগিতা মিললেও তা যথেষ্ট না। প্রতিবন্ধী সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে চান মাইনুদ্দীন। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চান তিনি। প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মাইনুদ্দীনকে সকল ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা আখানগর ইউনিয়নের বলিতা পাড়া গ্রামের মাইনুদ্দীন। নিজে শারীরিক প্রতিবন্ধী। জন্মের পাঁচ বছর পর টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে শরীরের হাত ও দুটি পা অকেজো হয়ে যায়। অনেক চিকিৎসা করেও আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। সে অবস্থাতে নিজের চেষ্টায় ১৯৯২ সালে এসএসসি পাস করেন তিনি। পরবর্তীতে গ্রমের বাচ্চাদের পড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

১৯৯৫ সালে একই গ্রামের ফজিলা খাতুনের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের ঘরে জন্ম নেয় একে একে তিন সন্তান। জন্মগতভাবে সুস্থ থাকলেও পরবর্তীতে অজ্ঞাত রোগে বড় ছেলে রাকিব উদ্দীন ও মেজ ছেলে সাকিব উদ্দীন প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ে। অকেজো হয়ে যায় তাদের দুই হাত ও পা। মাইনুদ্দীনের পৈতৃক সম্পত্তি না থাকায় বর্তমানে ভিক্ষা করে পরিবারের খরচসহ দুই সন্তানকে লেখাপড়া করাচ্ছেন।

মাইনুদ্দীন জানান, তিনি ভিক্ষা করতে চান না। একসময় গ্রামের স্কুলের শিক্ষার্থীদের টিউশনি করাতেন তিনি। কিন্তু তার শরীর অকেজো হয়ে যাওয়ায় তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। গ্রামের মানুষ ছোঁয়াচে রোগ মনে করে তার কাছে আসতে চায় না। প্রতিবন্ধী সন্তানদের শিক্ষিত করতে ও সংসারের খরচ যোগাতে অনেটা বাধ্য হয়েই মানুষের কাছে হাত পেতেছেন তিনি। মাইনুদ্দীন আরো জানান, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি তার প্রতিবন্ধী দুই ছেলের লেখাপড়ার খরচ বহন করতেন তাহলে তারা ভবিষ্যতে সমাজের বোঝা হয়ে থাকবে না, সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে স্বাবলম্বী হতে পারবে। প্রতিবন্ধী কোটায় সরকারি চাকরি করে পরিবার ও সমাজের সেবা করতে পারবে।

খাবার যোগাতে অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে দিশেহারা মাইনুদ্দীনের স্ত্রী ফজিলা খাতুন জানান, ছোট একটি বাঁশের ভাঙা ঘরে গাদাগাদি করে সকলেই বসবাস করি। টাকার অভাবে সে ঘরটিও মেরামত করতে পারেন না। যেকোনো সময় বড় কোনো ঝোড় বাতাস হলেই ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। খেয়ে না-খেয়ে শত কষ্টে সংসার চলছে তাদের। সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য সরকারি সহায়তা চান তিনি।

এদিকে প্রতিবন্ধী সন্তানরাও সমাজের বোঝা না হয়ে লেখাপড়া শিখে স্বাবলম্বী হতে চায়, স্বপ্ন দেখে চিকিৎসক হয়ে সকলের সেবা করতে।

শারীরিক প্রতবন্ধী বড় ছেলে রাকিব উদ্দীন জানায়, তার বাবা অনেক কষ্ট করে ভিক্ষা করে তাদের মানুষ করার জন্য দিনরাত চেষ্টা করে যাচ্ছে। সমাজে সবাই তাদের অবজ্ঞা করে। প্রতিবেশী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহপাঠীরাও তাদের সাথে দূরত্ব রেখে চলে। তার খুব কষ্ট হয়। রাকিব আরো জানায়, আমরাও তো এই সমাজের মানুষ! কিন্তু মানুষ হিসেবে আমাদের কেউই দেখে না। সবাই মনে করে আমরা কোনো জন্তু-জানোয়ার!

প্রতিবন্ধী মেজ ছেলে সাকিব উদ্দীন জানায়, কোনোদিন একবেলা, কোনো কোনো দিন দুই বেলা কপালে খাবার জোটে তাদের। পরিবারের এমন অবস্থা দেখে তার খুব কষ্ট হয়। তাই কষ্ট হলেও পড়ালেখা করে শিক্ষিত হয়ে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে চায় সে। স্বপ্ন দেখে বড় হয়ে ডাক্তার হয়ে তাদের মতো হতদরিদ্রদের পাশে থেকে সহযোগিতা করবে সে।

সরকারি সহায়তার বিষয়ে স্থানীয় আখারনগন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নূরুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, মাইনুদ্দীনকে প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড দেওয়া হয়েছে। সরকারিভাবে তার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সহায়তা আসলে তাকে দেওয়া হবে।

ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ডাক্তার শাহজাহান নেওয়াজ জানান, শারীরিক প্রতিবন্ধিতা কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। তাদের সমন্ধে মানুষ যেটা বলে তা ঠিক নয়, পোলিও ও টায়ফয়েডে আক্রান্ত হয়ে সঠিক চিকিৎসা না করার কারণে এমন হতে পারে। জেলা সমাজসেবা দপ্তরের সহকারী পরিচালক মনিরুল ইসলাম জানান, একই পরিবারের তিনজন প্রতিবন্ধী বিষয়টি তার জানা ছিল না।

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, দরিদ্র প্রতিবন্ধী শিশু দুটিকে সুশিক্ষিত করতে সরকারি সহায়তা প্রদান করা হবে। এ ছাড়াও সরেজমিনে গিয়ে তাদের সাথে কথা বলে সকল সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
Close