ধর্ম

নবীজীর হাস্যরসিকতা ও আমাদের শিক্ষা

এখনই সময়:

জীবন এক গতিতে চলতে পারে না। সবাই এখন যান্ত্রিক; কর্মযজ্ঞে হাবুডুবু খেতে থাকে প্রতিটি মুহূর্তে।

ব্যস্ততা সবার অনেক বেশি। স্ত্রী,সন্তানদের সময় দেয়ার সুযোগ হয়ে ওঠে না। কাজের চাপে,বসের প্রেসারে দিনশেষে যখন বাসায় ফেরা হয়, তখন মন-মেজাজ থাকে গুরুগম্ভীর। খিটখিটে।

পরিবারের সঙ্গে ভালোভাবে দুটো কথা বলতে হয় না। একঘেয়েমির কারণে সেই মানসিকতা তখন আর থাকে না। এভাবে পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। যেটা কারও কাম্য নয়।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু আমাদের আদর্শ, তাই তার জীবন আমাদের অনুসরণ করা উচিত।

জীবন কীভাবে সুখের ও শান্তির হতে পারে, কীভাবে পরস্পরে ভালোবাসা ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি পেতে পারে, সেই দৃষ্টান্ত রাসূলের জীবনীতে আছে।
তিনি যেমন অন্যায়-অপরাধের বিচার করতেন, কিসাস ও দিয়্যাত প্রতিষ্ঠা করতেন, তেমনি পরম মমতায় সাহাবিদের আগলেও রাখতেন। তাদের প্রতি ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যতার সর্বোচ্চ নজরানা স্থাপন করতেন। সাহাবী ও স্ত্রীদের সঙ্গে হাস্যরসিকতা ও ক্রীড়া-কৌতুকও করতেন।

নবীজী ছিলেন কোমল স্বভাবের। হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, একদিন আমি আর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (লোকচক্ষুর আড়ালে) দৌড় প্রতিযোগিতা করলে আমি অগ্রগামী হয়ে গেলাম। আর তিনি পরাজিত হলেন। পুনরায় আরেকদিন দৌড় প্রতিযোগিতা করলে রাসূল আমাকে পরাজিত করে দিলেন। কারণ, তখন আমার শরীর কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছিল।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের খুশি রাখার জন্য বৈধ অনেক কিছুই করেছেন।

একদিন হযরত আবুবকর রাযিয়াল্লাহু আনহু নবীজীর ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন, আর তখন শুনতে পেলেন, তার মেয়ে নবীপত্নী হযরত আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) নবীজীর সঙ্গে উচ্চ আওয়াজে কথা বলছেন। আবুবকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) মেয়ের এমন কর্মে রাগান্বিত হয়ে তাকে থাপ্পড় মারার জন্য উদ্যত হলেন। কিন্তু নবীজী (সা.)তার হাত ধরে ফেললেন।

অতঃপর, ‘ভবিষ্যতে আর কখনও যেন তার সঙ্গে তোমাকে এমন করতে না দেখি,’ এ কথা বলে রাগ নিয়েই তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। রাসূল তখন মুচকি হেসে হযরত আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)কে বললেন, দেখলে, তোমাকে মার থেকে বাঁচানোর জন্য কীভাবে আমি লোকটার হাত ধরে ফেললাম!

এ ঘটনার বেশ কিছুদিন পরে হযরত আবুবকর (রা.) আবার আসলেন নবীজীর ঘরে। এসে দেখলেন তার মেয়ে আয়েশা আর নবীজী, দু’জনই খুব হাসি-খুশিতে আছে। পূর্বের সেই মনোমালিন্য নেই।

এ দৃশ্য দেখে বললেন, তোমাদের মধ্যকার (স্বামী-স্ত্রীর) ‘যুদ্ধে’ যেমন আমাকে শরিক করেছিলে, আশা করছি, তোমাদের এই ‘সমঝোতাতে’ও আমাকে শরিক করবে। (আবু দাউদ)

নবীজী (সা.) যে শুধু স্ত্রীদের সঙ্গেই এমন মজা করে কথা বলতেন,তা নয়। স্থান-কাল পাত্রভেদে আরও অনেকের সঙ্গেই রসিকতা করতেন। খোশগল্প করতেন। যার কারণে যে ব্যক্তিই রাসূলের সাহচর্যে আসত,সীমাহীন মুগ্ধ হতো। তাকে সবচেয়ে আপন ভাবতে পারত এবং যে কেউ রাসূলের সঙ্গে যে কোনো কথা বলতে পারত।

হযরত আওফ ইবনে মালিক আল আশজাঈ বলেন, আমি তাবুক যুদ্ধের দিন নবীজীর কাছে গেলাম। তিনি একটি চামড়ার ছোট তাঁবুতে অবস্থান করছিলেন। আমি সালাম দিয়ে তাঁবুতে প্রবেশের অনুমতি চাইলাম।

নবীজী (সা.) বললেন, ভেতরে আস। তখন আমি বললাম ,হে আল্লাহর রাসূল, আমি কি আমার সম্পূর্ণ শরীর নিয়েই তাঁবুতে প্রবেশ করব? তিনি মুচকি হেসে উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, সম্পূর্ণ শরীর নিয়েই ভেতরে আস। (আবু দাউদ)

হযরত আনাস (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি নবীজীর কাছে এসে একটি সওয়ারী চাইল। নবীজী বললেন, সফর করার জন্য আমি তোমাকে উটের একটি বাচ্চা দিতে পারি।

তখন লোকটি বলল, উটের বাচ্চা দিয়ে আমি কী করব? (আমার তো সফরের জন্য সওয়ারি প্রয়োজন!) অতঃপর, নবীজী মুচকি হেসে বললেন, উটতো উটের বাচ্চাই প্রসব করে! (তিরমিযী, আবু দাউদ)

ওপরে উল্লিখিত হাদিস এবং ঘটনা থেকে বোঝা যায়, স্ত্রী-সন্তান ও পরিবারপরিজনের সঙ্গে সব সময় গুরুগম্ভীর, রূঢ়ভাব নিয়ে থাকা উচিত নয়। মাঝে মাঝে তাদের সঙ্গে মনখুলে কথা বলতে হবে। খোশগল্প করতে হবে। সুবিধা-অসুবিধার কথা শুনতে হবে।

আশা করা যায়, এতে পারিবারিক ও আত্মীয়তার বন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
Close