মুক্তমত

ঋণখেলাপি সংস্কৃতি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়

এখনই সময়:

বাংলাদেশ ব্যাংকের দীর্ঘদিনের দুর্বল ব্যবস্থাপনা দেশে ঋণখেলাপি সংস্কৃতি তৈরি করছে। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে আট হাজার ২৩৮ জন ঋণখেলাপির তালিকা পেশ করেছেন। যে সমস্ত কোম্পানি এবং ব্যক্তিবর্গের নাম তালিকায় এসেছে তাতে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ কিছুটা হলেও বিস্ময়ে হতবাক হয়েছি। এদের মধ্যে এমন ব্যক্তি ও কোম্পানির নাম রয়েছে যারা বেশ ভালোভাবে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করছে। এদের কাছে ৯৬ হাজার ৯৮৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ রয়েছে।

গত এগারো বছর ধরে দেশে উন্নয়নের স্থিতিশীলতা বহমান। এমন অবস্থায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির কথা। ঋণখেলাপি হওয়ার বদলে বরং সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে নির্দিষ্ট সময়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের টাকা পরিশোধ করা দরকার। সরকারপ্রধান গত দেড় বছরের অধিককাল ধরে ছয় শতাংশ হারে আমানত এবং নয় শতাংশ হারে ঋণ দেয়ার প্রস্তাবনা করে আসছেন। অথচ ব্যাংকগুলো এখনো সেটি বহাল করেনি। আগামী এপ্রিলের মধ্যে বহাল করতে পারে। যদিও দেখা যায়, আমানতের উপরে গড়ে কার্যকরী সুদের হার হচ্ছে ৫.২৬% অথচ ৬% করতে কী অসুবিধা তা বুঝি না। তবে আমানতের ওপর সুদ হ্রাস করার সিদ্ধান্ত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। যখন বিনিয়োগযোগ্য ফান্ডের পরিমাণ হ্রাস পায়, তখন লোন প্রাইসিংয়ের রেইট বেড়ে যায়। নন পারফর্মিং লোনের পরিমাণ বেশি হলে এমনটি ঘটে। তাছাড়া যেভাবে বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোনো কোনো ব্যাংকে বেতন ভাতাদি ছাড়াও বোনাস দিচ্ছে তাতে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ খরচ তো বেড়ে গেছে। ফলে যতক্ষণ না দেশের সাধারণ মানুষের আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ব্যাংকিং বেতন কাঠামো কিংবা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সাজ-সজ্জার খরচ রাখা হবে ততক্ষণ এটি একটি দুর্বোধ্য চক্রের মধ্যে পড়ে যায়। খেলাপি ঋণ সংস্কৃতি বাড়ার পেছনে যোগ্য লোককে যোগ্য স্থানে পদায়ন না করাটি একটি বড় সমস্যা। উপরের চাপ বা বহিঃস্থ চাপ সব সময়ই ব্যাংকিং ব্যবসায় থাকে। কিন্তু সেটিকে সামাল দিতে হলে যে ধরনের দক্ষ মানবসম্পদের দরকার, সে ধরনের মানবসম্পদ বর্তমানে ব্যাংকে নেই। বস্তুত দিন দিন বেতন ভাতাদি বৃদ্ধির সাথে সাথে অদক্ষ ব্যাংক কর্মকর্তার সংখ্যা বাড়ছে বলে প্রতীয়মান হয়।

একটি গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছি যে, ৭৫% ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের বা নিজস্ব ব্যাংকের সার্কুলার মনে থাকে না। যত দ্রুত চাকরি থেকে অন্যত্র যাওয়া যায় সেজন্যে তারা কেবল ব্যস্ত থাকে। আবার লোভাতুর দুনিয়ায় কেবল লোভ-লালসায় ভরপুর থাকে। আর সেখানে বর্তমানে মানি মেন্ট্রিক সোসাইটিতে অনেকের পক্ষে লোভ-লালসা সম্ভরণ করা সম্ভব হয় না।

গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত নন পারফর্মিং ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। এটি আসলেই অনেক কমানো যেত- যদি দক্ষতার সাথে পাঁচটি ‘সি’ মেনে ঋণ বিতরণ করা যেত। মনে পড়ে ২০০২ সালে সাইফুর রহমান যখন বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থার কারওয়ান বাজার শাখায় সুন্দরবন হোটেলের তৎকালীন মালিককে ঋণ দিতে বলেছিলেন এবং সুন্দরবন হোটেলের সেই মালিক দু’দিনে তিনটি স্থান দেখিয়েছিলেন কোলাটেরাল হিসেবে। আমি বরং শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে ফাইলটি প্রজেক্ট ইম্পলিমেটেশান বিভাগে পাঠিয়ে দিই- অথচ ঋণ দিইনি। আসলে সাময়িকভাবে হয়ত সৎ থাকলে ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে লাভের পাল্লাই ভারী। সততার বিকল্প নাই।

বিধি নিষেধ লঙ্ঘন করে ২৫ জন পরিচালক তাদের নিজস্ব ব্যাংক থেকে ১৬১৪ কোটি টাকা গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত নিয়েছেন। এই সমস্ত পরিচালকদের দ্রুত বিচার ব্যবস্থার আওতায় আনা দরকার। অন্য ব্যাংক থেকে ৫৫ জন পরিচালক নিয়েছে ১৭১, ৬১৬ কোটি টাকা। এ যে বিপুল স্বর্ণের খনি। সরকারপ্রধান যেখানে সাধারণ মানুষের জীবন মান উন্নয়নে ব্যস্ত, সেখানে এ ধরনের ঘৃণ্য কৃতকর্ম করে এ সমস্ত রক্তচোষা পরিচালকরা দেশের শত্রু হিসেবে পরিগণিত হবে। আরব বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক সর্বোচ্চ পরিমাণের ঋণ ৯০৭.৪৭ কোটি টাকা নিয়েছে তাদের স্ব প্রতিষ্ঠান থেকে- যেটি অর্থমন্ত্রীর তথ্য ভাষ্যে প্রতিফলিত হয়েছে।

তবে ভালো কাজের প্রশংসাও করতে হয়। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের এবং আইসিবি ইসলামী ব্যাংক তাদের পরিচালকদের কিংবা অন্য ব্যাংকের পরিচালকদের ঋণ দেয়নি। এটি অবশ্যই বলব ব্যাংকের ম্যানেজমেন্টের সাথে জড়িতদের কর্তব্যজ্ঞান এবং পরিচালকমণ্ডলীর যথাযথ নিয়ম মেনে চলেছেন। অবস্থা দৃষ্টি ধনা বাছতে গা উজাড়। মনে পড়ে ১৯৯৮ সালে যখন বিআইবিএম ও ফ্যাকাল্টি মেম্বার হিসেবে ছিলাম -তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সাথে এক বৈঠকে মন্তব্য করেছিলেন যে, বর্তমানে যারা ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাদের একেকজন কী অবস্থায় চাকরি শুরু করেছিলেন আর এখন কী পরিমাণের ধন দৌলতের অধিকারী হয়েছেন। অধিকাংশ ব্যবস্থাপনা পরিচালক তার ওপর সেদিন রুষ্ট হয়েছিলেন। আজ ২০২০ সালে মনে হয় না কোনো ডেপুটি গভর্নর ওই ভাষায় বলতে পারবেন। কেননা বর্তমানে এক একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিপুল বিত্ত বৈভবের মালিক।

ঋণখেলাপি তালিকায় রিমেক্স ফুটওয়ার সবচেয়ে বেশি ঋণখেলাপি, যার পরিমাণ হচ্ছে এক হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে ক্রিসেন্ট লেদার প্রোডাক্টস এবং রূপালী কম্পোজিট লেদারওয়্যারের কাছে এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা করে পাওনা। আসলে ঋণখেলাপিদের চামড়া গন্ডারের। রাস্তার মাঝখান দিয়ে দু’কান কাটা থাকায় বোধ হয় হাঁটতে সুবিধা হয়। আসলে দেশের উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে একটি সংঘবদ্ধ চক্র নাকি পৃথকভাবে এ ধরনের ঋণখেলাপি বাড়াচ্ছে তা দেখা দরকার।

এদিকে সোনালী ব্যাংক তার ঋণখেলাপি অর্থের পরিমাণ ৩১৯৭.৪৫ কোটি টাকা হলেও মাত্র ৮২০.৩৫ কোটি টাকা আদায়ে সক্ষম হয়েছে। বাদবাকি ঋণের মধ্যে ২৩৭৭.১ কোটি টাকা অনাদায়ি ঋণকে রেগুলারাইজ করেছে। বর্তমানে আদায়ের হার কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে সামনে কোনো নির্বাচন নেইÑ ফলে ঋণ গ্রহীতারা যে ঋণ পরিশোধ করলে কোনো ভালো কিছু সুবিধা অর্জন করতে পারবে এমনটি তারা মনে করেন না। তাদের ধারণা ব্যাংক থেকে যে ঋণ নিয়ে গেছেন তা পরিশোধ না করলে আখেরে তাদের লাভ হবে। যে ঋণের সিংহভাগ বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালকেরা নিয়ে গেছেন, তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিচারহীনতার কারণে এমনটি হয়েছে।

বিশ^াসযোগ্যতা এমন তলানিতে পৌঁছেছে যে, একজন সাধারণ ক্যাশিয়ারও সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যাংক থেকে লোপাট করতে কসুর করেননি। জনগণের টাকাকে রাজাকার আলবদরের মতো ব্যবহার করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ।

এদিকে পুঁজির ধর্ম হচ্ছে গ্রাম থেকে শহরে আসবে। আর এটি সার্থকভাবে করার জন্য বাংলাদেশ ব্র্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রামীণ অঞ্চল থেকে পুঁজি নিয়ে আসছে। কিন্তু গ্রামীণ অঞ্চলের বিনিয়োগ নেই। কয়েক বছর আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কে ক্ষুদ্র বিনিয়োগে আনার জন্যে একটি মডেল তৈরি করে দেশে বিদেশে প্রশংসিত হয়েছিল। দেখা গেল সেই মডেলে যে ব্যাংকের নাম প্রস্তাবনা করেছিলাম, সেটি তৎকালীন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্ণধাররা হাইজাক করে নিয়ে অন্য একটি সংস্থার ব্যাংকে নাম দিয়েছে। আসলে এখন নতুন করে প্রস্তাবিত কাঠামোয় সোসাইটাল ব্যাংকিং নাম দিতে হচ্ছে- অথচ কমিউনিটি ব্যাংকিং নামটি আমি অনেক আগে মডেলে ব্যবহার করেছিলাম। বস্তুত সঞ্চয় বিনিয়োগ ভারসাম্যের ব্যবস্থা না করলে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ভুলে যায়। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য দিয়েছিলেন তার প্রথমটি ছিল সঞ্চয়- বিনিয়োগে ভারসাম্য আনয়ন করা। এজেন্ট ব্যাংক এখন ঋণ খেলাপিদের সহায়ক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

লেখক: ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়াল ইকোনোমিস্ট এবং প্রফেসর

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
Close