মুক্তমত

একটা ভাল নির্বাচন হোক

এখনই সময়:

আজ ভোট, ঢাকা সিটির ভোট। কেন্দ্রে অবস্থান করা সবচেয়ে বড় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন। তাই এর আমেজ অনেকটাই জাতীয় নির্বাচনের মত। উত্তর ও দক্ষিণ– দুইভাগে বিভক্ত একটি সিটির দুই মেয়র পদে লড়াইটাও হচ্ছে বড় দুই দলে, চির প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা আর ধানের শীষ প্রতীকে।

নির্বাচনে যে দু’জন মেয়র পদে জয় লাভ করবেন, তারা কতটা এই নগরবাসীর জন্য করতে পারবেন তা নিয়ে সংশয় আছে। কিন্তু তবুও প্রত্যাশা একটা ভাল নির্বাচন হোক। এই নির্বাচন নিয়ে বড় কোন প্রশ্ন না উঠুক।

‘মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন একটি সুযোগ এনে দিয়েছে নির্বাচন কমিশনের সামনে। তাদের যে সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে, এর প্রয়োগ আজকে ভোটের দিনে করতে হবে যথাযথভাবে। গণতন্ত্রে নির্বাচন হলো অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে এর পরিণতি বিরূপ হতে বাধ্য।’

নির্বাচন কমিশন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোটের। কিন্তু প্রচারণার শেষ দিকের বাতাবরণে ছিল উত্তেজনা। বেশ কয়েকটি অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটেছে, প্রার্থীর ওপর হামলা হয়েছে, অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। কিন্তু কমিশনের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া ছিল না। তবে এবার বড় ধরনের কোন সহিংসতা হয়নি, সেটাকেই বড় পাওয়া হিসেবে দেখতে হচ্ছে।

নগরবাসী অত্যন্ত বেদনার সাথে লক্ষ্য করেছে যারা পরিবেশবান্ধব নগর উপহার দিবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারাই পলিথিনে মোড়ানো পোস্টারে পুরো শহর ছেয়ে ফেলেছেন, তারাই মারাত্মক শব্দ দূষণ সৃষ্টি করে ঘরে ঘরে পরীক্ষার্থী আর অসুস্থ মানুষকে যন্ত্রণা দিয়েছেন। যারা নিয়ম আর শৃঙ্খলার কথা বলেন, তারাই আচরণবিধি লংঘন করে রাস্তা আটকে, ফুটপাত দখল করে মিছিল আর সমাবেশ করেছেন।

এসবের মধ্য দিয়েই আজ ভোটের দিনটি উপস্থিত হল। বিরোধী পক্ষের আপত্তির মধ্যেই ইভিএম-এ ভোট হচ্ছে। আধুনিক সময়, সমাজ, তাই প্রযুক্তিকে স্বাগত জানাতেই হয়। সে কারণে আশা থাকবে এই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে যেন প্রশ্ন না উঠে। এটি নির্বাচন কমিশনের জন্য এক পরীক্ষা। এই উত্তীর্ণ হওয়া কিন্তু খুব কঠিন কমিশন ও প্রশাসনের পক্ষে। উত্তীর্ণ না হলে ভবিষ্যতের পথটা কণ্টকাকীর্ণ হয়ে উঠবে।

নির্বাচন পরিচালনা করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু সব দায় কি কমিশনকে দেওয়া যায়? রাজনৈতিক দলগুলোর কি কোন দায়িত্ব নেই? পরিতাপের বিষয় এই যে, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিষ্ঠান চালায় যেমন, সংসদ, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, প্রশাসন ইত্যাদি, কিন্তু তাদের মধ্যে ছিটেফোটাও প্রাতিষ্ঠানিকতা নেই। তারা নিজেরা শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারেনা, নিয়ম আর আচরণবিধি মানতে উদ্যমী হয় না। তারা তাদের কর্মীদের দল সচেতন করতে পারলেও পারেনা রাজনীতির সঠিকতা শেখাতে।

পরিস্থিতি দেখলে মনে হয়, যে সংঘাতময় রাজনৈতিক সংস্কৃতি লালিত হয়ে আসছে এদেশে তার বিনাশ নেই। কিন্তু তবুও আশা থাকে। কিছু ঘটনা বাদ দিলে বোঝা যাচ্ছে, এই নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। এমন প্রেক্ষাপটে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে এই নির্বাচন সম্পন্ন করা নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন একটি সুযোগ এনে দিয়েছে নির্বাচন কমিশনের সামনে। তাদের যে সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে, এর প্রয়োগ আজকে ভোটের দিনে করতে হবে যথাযথভাবে। গণতন্ত্রে নির্বাচন হলো অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে এর পরিণতি বিরূপ হতে বাধ্য।

এবং আবারও বলব শুধু নির্বাচন কমিশনই নয়; সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট সব মহলসহ রাজনৈতিক দলগুলোকেও সচেতন হতে হবে। নির্বাচন কমিশনের সামনে ঘুরে দাঁড়ানোর যে সুযোগটা ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে নিয়ে এলো, সেটি যে হাতছাড়া না হয়।

একটা কথা সব দলকেই মনে রাখতে হবে যে, নির্বাচনী ব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক রাজনীতি, ভিন্নমতাবলম্বীদের অধিকার দেবার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে অনেক ক্ষত রয়ে গেছে। এই ক্ষত নিরাময়ের চেষ্টা সবাইকেই করতে হবে। সরকারি দলের দায়িত্ব বেশি, কিন্তু বিরোধী দলকেও সহনশীল আচরণ করতে হবে। বারবার যদি নির্বাচন কমিশনকে অযোগ্য, অদক্ষ, পক্ষাপতদুষ্ট বলে গালি দেওয়া হয়, তাহলে কমিশনের পক্ষে কাজ করা কঠিন। সমালোচনা থাকবেই, কিন্তু তা কতটুকু এবং কোন বিবেচনায় করা হবে তা ভাববার বিষয়। সব পক্ষ চাইলে সবার অধিকার নিশ্চিতকরণসহ ভীতিমুক্ত, চাপমুক্ত ও স্বচ্ছ নির্বাচনী পরিবেশ গড়ে তোলা মোটেও কঠিন কোনো বিষয় নয়। সবার কথা ও আচরণে সেটা বিবেচনায় নিতে হবে। অবাধ নির্বাচনের পথে যত রকম প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান, সেসবের নিরসন ঘটাতেই হবে।

আজকের ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন স্থানীয় সরকার কাঠামোর একটি স্তরের নির্বাচন হলেও তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোট ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি দেশের মানুষের অনাস্থা যদি কিছু থেকে থাকে তবে তা নিরসনের পথ সৃষ্টি হতে পারে এর মধ্য দিয়েই।

লেখক : প্রধান সম্পাদক, জিটিভি।

আরও সংবাদ

মন্তব্য করুন

Back to top button