মুক্তমত

করোনাভাইরাস : মহা বিপদের সামনে মানবজাতি

এখনই সময়:

আমরা অর্থনীতিতে মালথাসের জনসংখ্যাতত্ত্ব পড়েছিলাম। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে মানুষ যদি সতর্ক না হয় মালথাস বলেছেন তখন প্রকৃতি নাকি তার স্বব্যবস্থা গ্রহণ করে। মাঝে মাঝে বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণ সংহার হয়। এখন চীন জুড়ে করোনাভাইরাস দেখা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিখ্যাত গবেষণা কেন্দ্র জন হপকিনস সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটি ৬ মাস আগেই সতর্ক করেছিল যে নতুন এক ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে লাখ লাখ মানুষ মারা যাবে। তারা আন্দাজ করেছে বিশ্বে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সাড়ে ছয় কোটি মানুষ মারা যাওয়ার আশঙ্কা আছে। তাহলে বলতে হয় মানবজাতির জন্য এই ভাইরাস এক মহা বিপদ ডেকে আনছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিখ্যাত গবেষণা কেন্দ্র জন হপকিনস সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটি ৬ মাস আগেই সতর্ক করেছিল যে নতুন এক ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে লাখ লাখ মানুষ মারা যাবে। তারা আন্দাজ করেছে বিশ্বে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সাড়ে ছয় কোটি মানুষ মারা যাওয়ার আশঙ্কা আছে। তাহলে বলতে হয় মানবজাতির জন্য এই ভাইরাস এক মহা বিপদ ডেকে আনছে।

মাত্র কয়েকদিন আগে (৩১ ডিসেম্বর ২০১৯) চীনের তিন হাজার বছরের প্রাচীন শহর হুবেই প্রদেশের উহানে প্রথম করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটে। এই কয়দিনে ভাইরাসটি বিশ্বের বহু দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। চীন ছাড়াও থাইল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, জাপান, নেপাল, কানাডা, সাউথ কোরিয়া, ফ্রান্স, এমনকি আমাদের পড়শী ভারতেও একজন বিদেশী মারা গেছে দেখলাম।

ভাইরাসের কারণে অনেক দেশ তার নাগরিকদের চীন ভ্রমণে বারণ করছে। যুক্তরাষ্ট্রেও কয়েকজনের এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর দেশটি তার নাগরিকদের চীনা ভ্রমণের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছে, বিশেষ করে উহান যেই প্রদেশে সেই হুবেই ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে। অনেক দেশ আটকে পড়া নাগরিকদের আনার ব্যবস্থা করেছে। বাংলাদেশের কয়েক শ’ ছাত্র চীনের উহান শহরে আটকে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদেরকে আনার ব্যবস্থা নিতে বলেছেন।

দ্রুততম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বিশ্বব্যাপী ভাইরাস ছড়াতে এখন তেমন কোনো সময় লাগে না। নব্য এই রোগের কোনো ভ্যাকসিন এখনো আবিষ্কার হয়নি। যেখান থেকে রোগটা ছড়িয়েছে সেখানে বন্যপ্রাণীর কেনাবেচার একটা বাজার ছিল। সেই বাজার থেকে রোগটি ছড়িয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এই রোগটা নিউমোনিয়ার মতো।

চীনের চতুর্পাশের দেশগুলো খুবই সতর্ক অবস্থা অবলম্বন করেছে। বাংলাদেশ সীমান্তের প্রবেশপথ এবং বিমান পথেও খুব কড়াকড়ি তল্লাশি ব্যবস্থা আরোপ করেছে বলে পত্রিকায় দেখলাম। তবে তা কতটা কার্যকর রেজাল্ট দিতে পারবে, মানে জীবানুর পথ আটকাতে পারবে কিনা- সেটা নিয়ে অনেকে সন্দিহান। খবরে দেখলাম, বাংলাদেশেও চীন থেকে আসা যাত্রীদের ওপর রাখা হচ্ছে সতর্ক নজরদারি। বিমানবন্দরে সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্তে ৩টি থার্মাল স্ক্যানার থাকলেও একটি বিকল ছিল।

২০ ডিসেম্বর থেকে করোনাভাইরাস নিয়ে সতর্কতা নেওয়া শুরু হওয়ার পর ২৬ ডিসেম্বর ঠিক করা হয় থার্মাল স্ক্যানারটি। এছাড়া, শাহজালালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম অনুসারে করা হয়নি কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা। রোগ যাতে অন্য ব্যক্তিদের মাঝে ছড়িয়ে না পড়ে সে জন্য আক্রান্ত ব্যক্তিকে ঘরের মধ্যেই একনাগাড়ে থাকতে বলা কিংবা রাখাকেই ‘কোয়ারেন্টাইন’ ব্যবস্থা বলা হয়। আগামী ৬ মাসের মধ্যে নাকি বিশ্বের প্রতিটি দেশে এই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়বে আর তার পরবর্তী এক বছরের মধ্যে নাকি বিশ্বের সাড়ে ছয় কোটি লোক এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারাবে। কী ভয়াবহ খবর!

চীনের বক্তব্য অনুসারে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত শতাধিক লোক মারা গিয়েছে। কোনো প্রতিরোধক ওষুধ এখনো পর্যন্ত আবিষ্কৃত না হওয়ায় প্রতিরোধের চেষ্টা চলছে। সমগ্র চীনে এখন সবার মুখে শোভা পাচ্ছে মাস্ক। চীনে এখন মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, হ্যান্ড ওয়াশ এবং থার্মোমিটারের মত চিকিৎসা সামগ্রীর প্রচুর অভাব দেখা দিয়েছে। আশেপাশের ছোট ছোট দেশগুলো মাস্ক রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে।

চীনে গত কিছুদিন ধরে সোয়াইনফ্লুর আক্রমণে পশু সম্পদ নিয়ে দিশেহারা অবস্থা। এ রোগ প্রতিরোধ করতে না পেরে এ পর্যন্ত ৬ লক্ষ শুকর হত্যা করা হয়েছে। এখন শুধু পশু নয়, করোনাভাইরাসের কারণে মানুষও বিপদের সম্মুখীন হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পাঁচ কোটি লোক প্রাণ হারিয়েছিল। এখন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন সাড়ে ৬ কোটি লোক করোনাভাইরাসে প্রাণ হারাবে।

চীনা জাতির কাছে শূকরের মত সাপও প্রিয় খাদ্য। এবার নাকি করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে সাপের মাধ্যমে। এই ধরনের ভাইরাস আগে ছিল পশুপাখির মাঝে। অনেক পরিবর্তনের পর এখন মানবদেহে সংক্রমণ ঘটেছে। এই রোগ নাকি বাদুর থেকেও ছড়ায়। বিশেষজ্ঞরা সন্দেহ করছেন চীনে এই ভাইরাস সংক্রমণ হয়েছে সাপের মাংস থেকে। কেউ বলছেন বাদুরের স্যুপ থেকে। মধ্য চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে যে বাজারের সাপ ও সমুদ্রের মাছ বিক্রি হয় সেখান থেকে প্রথমে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে। তবে সমুদ্রের মাছে ভাইরাস ছড়ানো সম্ভব নয় বলে মনে করা হচ্ছে। তাই বিশেষজ্ঞদের ধারণা সাপের মাংস থেকেই ভাইরাস ছড়িয়েছে।

বাংলাদেশের অনেক মানুষ খেজুর গাছ থেকে পাতিল নিচে নামিয়ে কাঁচা খেজুরের রস খায়। যশোর অঞ্চলের এই অভ্যাসটা নাকি বেশি। এখন থেকে সকলকে সতর্ক হতে হবে কারণ রাত্রে খেজুরের রসের ঝুলানো কলসে মুখ দিয়ে বাদুরও কাঁচা রস খায়। করোনাভাইরাস ছোঁয়াছে কিনা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনো নিশ্চিত নয়। এই ভাইরাসের ব্যাপারে উদ্বেগের কারণ হচ্ছে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যে সারাবিশ্বের ছড়িয়ে পড়বে।

নিশ্চয়ই প্রতিষেধক ওষুধ আবিষ্কারের বিজ্ঞানীরা সচেষ্ট হয়েছেন কিন্তু কালকেই যে ওষুধ আবিষ্কার করা সম্ভব হয়ে যাচ্ছে তাও তো বলা যাচ্ছেনা। ক্যান্সারের উদ্ভব বহু প্রাচীনকাল থেকে। এখনো পর্যন্ত ক্যান্সারের সঠিক ওষুধ আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি।

আমাদের দেশে অসংখ্য হাস-মুরগী, পশু পাখির ফার্ম গড়ে উঠেছে। এইসব ফার্মেও হয়তো করোনাভাইরাস উৎপত্তি হতে পারে। সুতরাং সব ফার্ম মালিকদের উচিত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিকে মনোযোগী হওয়া এবং পশুপাখি সযত্নে দূরে রাখার ব্যবস্থা করা। ফার্মের ডিম, মুরগী পরিষ্কার করে তবেই বিক্রি করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের মানুষ হিন্দু হোক মুসলমান হোক- সব ধর্মের লোকই ধর্মপরায়ণ। পুরনো সময়ের কোনো চিকিৎসা ছিল না। তখন মানুষ দলবদ্ধভাবে নামাজ পড়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রতিকার চাইতো। এখনো মানুষের উচিত মসজিদ মন্দির, গির্জায় এই ভাইরাস থেকে বাঁচানোর জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করা, আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সম্পর্কে সতর্ক থাকা।

পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা চীনের বন্যপ্রাণী খাওয়াকে দুষলো এই ভাইরাসের জন্য। আমাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজনও বন্যপ্রাণী খেতে অভ্যস্ত। তাদেরকেও এই সময়ে সরকারিভাবে সতর্ক করা উচিত।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
[email protected]

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
Close