টেক

মুজিববর্ষ রূপকল্প ৪.০ বাস্তবায়নে প্রয়োজন তরুণদের পৃষ্ঠপোষকতা

এখনই সময়:

বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর একটি বড়ো অংশ তরুণ। দুঃখের বিষয় হলো, এদের একটি বড়ো অংশেরই কোনো কাজ নেই এবং কর্মসংস্থান নেই। দেশের বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। প্রতি বছরই কর্মবাজারে নতুন ২১ লাখ তরুণ-তরুণী যুক্ত হচ্ছে। সরকারি চাকরির মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, তা সবাই জানেন।

বিসিএস পরীক্ষার বিগত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান থেকে এই বিষয়টি সহজে অনুমেয়ও বটে। ৪০তম বিসিএস পরীক্ষায় ১ হাজার ৯০৩টি শূন্য পদ পূরণের জন্য আবেদন করেছিল প্রায় ৫ লাখ কর্মপ্রার্থী। ৩৪তম বিসিএস পরীক্ষায় ২,০৫২টি শূন্য পদ পূরণের জন্য আবেদন করেছিল ২ লাখ ২১ হাজার ৫৭৫ জন কর্মপ্রত্যাশী। ৩৩তম বিসিএসে ৪ হাজার ২০৬টি পদের বিপরীতে এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৯৩ হাজার ৫৯ জন প্রার্থী। শূন্য পদের তুলনায় আবেদনকারীর সংখ্যা আগামীতে আরো বাড়বে। বিশ্বব্যাপী এগিয়ে যাওয়া ও অগ্রসরমাণ দেশগুলো এই সমস্যার সমাধান করেছে লাখ লাখ উদ্যোক্তা তৈরি করে। এসব ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের উদ্যোক্তারা একই সঙ্গে দেশজ উত্পাদন যেমন বাড়ান, তেমনি তারা কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করেন। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে এসএমই সেক্টরের উন্নয়ন ও নারীদের অধিক হারে স্বকর্মসংস্থানে উত্সাহী করে তুলতে পারলে কর্মসংস্থানের একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যায়। বিশ্ব ব্যাংক তাদের অতি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও কর্মসংস্থান বাড়াতে পারলে জাতীয় প্রবৃদ্ধি দুই শতাংশ বাড়বে বলে মত দিয়েছে।

বাংলাদেশে উদ্যোক্তাদের পথ সহজ নয়। বাজার জ্ঞানের অভাব, আর্থিক খাতে প্রবেশ অগম্যতা, মার্কেটিং দুর্বলতা, ভাষা জ্ঞানের দক্ষতার অভাব এবং সর্বোপরি সমাজে উদ্যোক্তাবিরোধী পরিবেশ নতুন উদ্যোক্তাদের মোটেই উত্সাহ জোগায় না। এই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন)’ বিগত কয়েক বছর ধরে স্বতন্ত্র আইটি উদ্যোক্তাসহ উদ্যোক্তা তৈরির কাজ করে চলেছে।

এখনকার উদ্যমী ও উচ্চাভিলাষী তরুণেরা আর আগের মতো ৯টা-৫টার অফিস জব করতে চায় না বরং তারা প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ নিতে পছন্দ করেন এবং নিজের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে ভালোবাসেন। চাকরি নামক সোনার হরিণের পেছনে ছোটাছুটি করে ধৈর্যহারা কিংবা জীবনের মূল্যবান সময়টুকু হারাতে চান না বরং তারা চান উদ্যোক্তা হয়ে ব্যবসায় করে অন্যদের চাকরি দিয়ে আনন্দ খুঁজে পেতে। তারা মনে করেন এতে এক দিকে যেমন নিজের একটা ভিত্তি হয়, তেমনি অন্য দিকে সমাজের বেকারদেরও একটা কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়। কিন্তু উদ্যোক্তা হতে চাইলেই কি আর ব্যবসা করে নিজের জীবনের স্বপ্নকে স্পর্শ করা যায়? এর জন্য প্রয়োজন সৃজনশীল মনোভাব, উদ্ভাবন, প্রশিক্ষণ ও মূলধন—এই চারের সংমিশ্রণ।

উদ্যোক্তারা বেশির ভাগই বয়সে তরুণ। দারুণ সম্ভাবনাময় এবং উদ্যমী এসব উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ সদ্য পা রেখেছেন ব্যবসায় অঙ্গনে, আর কেউ কেউ ব্যতিক্রমী সৃজনশীল ব্যাপক সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে এখানে সেখানে সময় অতিবাহিত করছেন। দেশে নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা অতীব প্রয়োজন। তাদের সৃজনশীল মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ, মূলধনের ব্যবস্থা এবং উত্পাদিত পণ্য বিপণনের ব্যবস্থাসহ উদ্ভাবনের জন্য সরকারের পর্যাপ্ত সহযোগিতা প্রয়োজন। আর এর মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তারা নিজের জন্য এবং দেশের মোট জাতীয় আয়ে অবদান রাখতে সক্ষম হবেন। দেশব্যাপী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোটো, মাঝারি ও বড়ো ধরনের উদ্যোক্তাদের হাতেই দেশের ভবিষ্যত্ নিহিত। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য দরকার প্রয়োজনীয় পরিমাণ জমি, পর্যাপ্ত অর্থ, যন্ত্রপাতির সরবরাহ ও দক্ষ শ্রমশক্তি। যদিও এই চারের সমন্বয়সাধন করবেন উদ্যোক্তা তথাপি সংশ্লিষ্ট সব ব্যক্তি তাকে অনুপ্রেরণা প্রদান করলে নতুন উদ্যোক্তার এতে করে ব্যবসায় করার প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে ও ব্যবসায় হবে গতিশীল। উদ্যোক্তাদের ভাবনাতেও আনতে হবে নিত্যনতুন কিছু করার আগ্রহ। নতুন উদ্যোগে কেউ ব্যর্থ হলে সে জন্য তার কাছ থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে অন্য কাউকে উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে প্রযুক্তির যথাযথ উত্কর্ষের বিকল্প নেই। মুজিববর্ষ রূপকল্প ৪.০ বলতে প্রধানত বোঝানো হয়েছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং বর্তমান সরকারের রূপকল্প ২০২১, রূপকল্প ২০৪১ এবং ডেল্টা প্ল্যানিং-২১০০ এর সমন্বিত বাস্তবায়নকে। সরকার ‘রূপকল্প ২০২১’ ঘোষণা করলেও তথ্য-প্রযুক্তিখাতে ক্ষুদ্র ও মাঝরি শিল্পের বা উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। দেশের তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতিতে ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং তথা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা নিউক্লিয়াস বা প্রাণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় তাদের যথাযথ সুযোগ কিংবা সহযোগিতা না থাকার কারণে প্রতিবেশী দেশ ভারতের মতো এ শিল্প বিকশিত হচ্ছে না। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ৯০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের অন্তর্গত। তাই সরকারের EEF কিংবা ইক্যুয়িটি এন্টারপার্টনারশিপ ফান্ডের জটিল ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করে সহজ-সরল ও সহনীয় ঋণ সুবিধার মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করা প্রয়োজন। তাহলেই এদেশে মুজিববর্ষ রূপকল্প ৪.০ সত্যিকারভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং গড়ে উঠবে ইনফোসিস, উইপ্রো, মাইক্রোসফট, অ্যাপল কিংবা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠান।

আরও সংবাদ

মন্তব্য করুন

Back to top button