মুক্তমত

বাংলাদেশ-ভারতের বন্ধুত্ব টিকবে তো!

এখনই সময়  :মহাত্মা গান্ধীর অহিংসা ও অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অনুসরণ করে মুসলিম দেশ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলের ডাক দিয়েছিলেনl গান্ধীজির মূল রাজনৈতিক দর্শন অহিংস ও অসহযোগ আদর্শকে সাফল্যের সাথে পুনরুজ্জীবিত করেন বঙ্গবন্ধু। এ ব্যাপারে বিশিষ্ট লেখক শ্রদ্ধেয় আব্দুল গাফফার চৌধুরী বলেন, গান্ধীজি আজ বেঁচে থাকলে বঙ্গবন্ধুর এই অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের অভূতপূর্ব সাফল্য দেখে নিশ্চয়ই আশীর্বাদ জানাতেন।

গান্ধীজীর অহিংসা ও অসাম্প্রদায়িকতার নীতিকে অনুসরণ করে মুসলিম দেশ পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠা করেন একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বাংলাদেশl এখন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীl নিজের জীবনকে বাজি রেখে প্রায় ৮৫% মুসলিমের নিবাস বাংলাদেশকে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তিনি প্রতিটি মুহূর্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেনl ২০২০ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের বিশাল আয়োজন দেশে এবং বিদেশে নেওয়া হয়েছেl বিশ্বের সব বাঙালি এই দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে পালন করবেl

ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক বর্তমানে অত্যন্ত ভালোl এর আগে আর কোনো সরকারের আমলে এতো ভালো সম্পর্ক কখনো হয়নিl বাংলাদেশ ভারতের এক বিরাট বাণিজ্যের বাজারl এছাড়া এখন প্রচুর ভারতীয় বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরতl অন্যদিকে বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে ভারতের বাণিজ্যিক ট্রান্সপোর্টের সুবিধা দেওয়া হয়েছেl এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ভারতকে যে সুযোগ সুবিধা দিয়েছে ভারত ততটা বাংলাদেশকে দেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছেl বরং ভারত এখন এনআরসি চালু করে ভারত থেকে অনেক বাঙালিকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেl ইতিমধ্যে নিরাপত্তাজনিত কারণে পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম থেকে অনেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করা শুরু করেছেl এই দুই প্রদেশে বসবাসরত মুসলমান বাঙালিরা এখন দুশ্চিন্তায় রয়েছেl বাংলাদেশ এতদিন ভারতকে যে চোখে দেখেছে ও ভারতের সংবিধানে যে ধর্মীয় বহুত্ববাদের কথা বলা হয়েছে বর্তমান ভারতে আর সেই আদর্শ নেইl এনআরসি বিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত। সুতরাং ভারত নিয়ে বাংলাদেশকে এখন নতুনভাবে ভাবতে হবেl

ভারতের ক্ষমতাসীন মৌলবাদী দল বিজেপি মহাত্মা গান্ধীর অহিংসা ও অসাম্প্রদায়িকতার নীতি থেকে এখন ভারতকে হিন্দু ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো একসময়ের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ভারতের পার্লামেন্টে এই বিলটির পক্ষে ভোট পড়ে ৩১১ আর বিপক্ষ পরে মাত্র ৮০ ভোট। অথচ এনআরসি হলো ভারতের সংবিধান, ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্য, সংস্কৃতির সাথে সম্পূর্ণ সংঘর্ষপূর্ণl এনআরসি এমন একটি আইন যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রভাব ফেলছেl সুতরাং তাকে কী করে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলা যায়?

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কংগ্রেস নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সরকার সব দিক দিয়ে সাহায্য করেছিল। আর এই কারণেই বাংলাদেশ ভারতকে সবসময় বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে দেখে আসছে। কিন্তু এখন কী হবে? এখনো কি বাংলাদেশের মানুষ বলবে ভারত আমাদের বন্ধু? নিশ্চয়ই নাl বরং হয়তো বলবে এগুলো হলো ভারতের দাদাগিরিl শক্তিশালী ও বৃহৎ দেশ হিসেবে ভারতের বর্তমান সাম্প্রদায়িক সরকার এখন যা করছে তা অনেকটা প্রভুসুলভ আচরণ, বন্ধুসুলভ নয়। এধরনের আচরণ বাংলাদেশের মানুষ ভারতের কাছ থেকে কোনোদিন আশা করেনি। আশা করতে পারে নাl

বাংলাদেশের মানুষ ও সরকার অসাম্প্রদায়িক। একাত্তরে ২৬ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের ডাকে বাংলাদেশের মানুষ মুসলিম দেশ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েl বঙ্গবন্ধু একটি অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। বহু বাধা-বিপত্তির মধ্যে দিয়ে আজ বঙ্গবন্ধু কন্যা বাংলাদেশকে একটি ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেনl ঠিক সেই মুহূর্তে ভারত এখন সাম্প্রদায়িক হিন্দু ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চলছেl বাংলাদেশের মানুষ ও সরকারের জন্য এমন পরিস্থিতি অবশ্যই নেতিবাচকl আগামীতে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব সম্পর্কে কি তাহলে ফাটল ধরবে?

এখন বাংলাদেশ সরকারকে ভারতের মৌলবাদী সরকারের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবেl ভারতের সাম্প্রদায়িক পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশে কোনো সমস্যা সৃষ্টি হলে তার জন্য দায়ী থাকবে ভারতl বাংলাদেশ ভারত সম্প্রীতি যাতে নষ্ট না হয় তার জন্য দুটো রাষ্ট্রকেই চিন্তা ভাবনা করা উচিতl বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে অবৈধভাবে যাতে কেউ প্রবেশ করতে না পারে এ ব্যাপারে সীমান্ত রক্ষী বাহিনীকে সজাগ থাকতে হবে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কঠোর নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্ব বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন।

বর্তমানে ভারতে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী সরকারl হিন্দুবাদের আদর্শে তারা মহাত্মা গান্ধীর অসাম্প্রায়িক ভারতকে সাম্প্রদায়িক আদর্শে সামনে নিতে চায়l এখন প্রশ্ন হলো ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র থেকে যে বিজেপি একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় সেই দলের নেতা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে আসতে পারেন কি? সাম্প্রদায়িকতার আদর্শের অনুসারী মৌলবাদী নেতা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কী করে আসবেন মহাত্মা গান্ধীর অনুসারী জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর মতো একজন অসাম্প্রদায়িক নেতার জন্মবার্ষিকীতে? ভারতের বর্তমান সাম্প্রদায়িক সরকারের বিভিন্ন আচরণ কি বন্ধুত্বের প্রকাশ নাকি প্রভুত্বের খবরদারি? বাংলাদেশের মানুষ এখনো মনে করে ভারত বাংলাদেশের বন্ধু, প্রভু নয়l বাংলাদেশ ভারত বন্ধুত্বের ফাটল ধরলে এর জন্য দায়ী থাকবে ভারতের বর্তমান সাম্প্রদায়িক নরেন্দ্র মোদি সরকার, ভারতবাসী নয়l

লেখক: জুরি সুইডিশ ইমিগ্রেশন কোর্ট ও আপিল কোর্ট

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
Close