মুক্তমত

আলহামদুলিল্লাহ ও ইন্নালিল্লাহ এর মাঝে সোলায়মানির হত্যাকাণ্ড

এখনই সময় :কাসেম সোলায়মানি বর্তমান দুনিয়ার অন্যতম সেরা কুশলী সামরিক কমান্ডার। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি ছায়াযুদ্ধে সাফল্যের প্রধান রূপকার, সিরিয়ার শিয়া প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের ত্রাতা ও আইএস জর্জরিত ইরাকের পুনরুদ্ধারকারী এই জেনারেলের হত্যাকাণ্ড নিঃসন্দেহে একটি মহাঘটনা। এ মুহূর্তে এটি অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্র ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাফল্য বলে বিবেচিত হবে। তবে সফলতা স্থায়ী হবে কিনা বুঝা যাবে, ইরানের প্রতিক্রিয়া কতটা ঝাঁঝালো হয়, তার ওপর।

কিন্তু কে এই সোলায়মানি?

মাত্র বিশ বছর বয়সে কাসেম সোলায়মানি সামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়ে ইরাক-ইরান যুদ্ধে অংশ নেন। সামরিক দক্ষতা ও দৃঢ়তার কারণে পদোন্নতির এক পর্যায়ে ১৯৯৮ সালে তিনি বিপ্লবী গার্ডের কুদ্স ব্রিগেডের কমান্ডার হন। তৎপূর্বে আফগান-ইরান সীমান্তে দায়িত্ব পালনের সময় মাদকপাচার নিয়ন্ত্রণে তিনি ভূমিকা পালন করেন।

সোলায়মানির ভূমিকা ইরানের বাইরে লেবানন, ইরাক ও সিরিয়ায় পরিব্যাপ্ত। ২০০৮ সালে ইরাকি সেনাবাহিনী ও মুক্তাদা আল-সদরের অনুগত মাহদি বাহিনীর মাঝে যুদ্ধের উপক্রম হয়, তখন সোলায়মানি মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেন। ২০১১ সালে সোলায়মানি মেজর জেনারেল হতে জেনারেল পদে উন্নীত হন। এ সময় আলি খামেনী তাকে জীবিত শহীদ উপাধি দেন।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানি প্রভাব বিস্তারের মূল কারিগর সোলায়মানি। তাকে হিজবুল্লাহ এর সামরিক উইং এর কার্যকরী প্র্ধান বলে গণ্য করা যায়। ২০১২ সালে তিনি সিরিয়ান হিজবুল্লাহ এর নেতৃত্ব দিয়ে বাশার-বিরোধী সুন্নি বাহিনীগুলোকে নির্মূল করেন। আল-কাসির এর যুদ্ধে সোলায়মানিকে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়।

ইরাককে আইএসমুক্ত করার লড়াইয়ে সোলায়মানি ভূমিকা পালন করেন, বিশেষত মুসেল ও ফাল্লুজা পুনরুদ্ধারে। তাই এক ইরাকি মন্ত্রী স্বীকার করেছেন, সোলায়মানি না হলে হায়দার এবাদির সরকার প্রবাসী সরকারে পরিণত হতো আর ইরাক হতো অস্তিত্বহীন।

সাম্প্রতিক ঘটনাবলি

অতি সম্প্রতি মার্কিন নাগরিক হত্যার অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক ও সিরিয়ার কয়েকটি হিজবুল্লাহ ঘাঁটিতে বিমান হামলা করে। এতে প্রায় ত্রিশজন নিহত হয়। জবাবে উত্তেজিত হিজবুল্লাহ সমর্থকরা বাগদাদের মার্কিন দূতাবাসে হামলা করে আগুন ধরিয়ে দেয়। এই উত্তেজনার সুযোগে মার্কিনীরা তাদের আপাতত বড় সাফল্য বাগিয়ে নিল। ৩ জানুয়ারি প্রত্যুষে বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে মার্কিন বিমান হামলায় জেনারেল সোলায়মানি নিহত হন।

বাংলাদেশের ফেসবুক ব্যবহারকারীদের অনেকে ইন্নালিল্লাহ লিখছেন, অনেকে আল-হামদুলিল্লাহ! সোলায়মানি আমেরিকার আতঙ্ক ছিলেন, কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ইরাক-সিরিয়ার সুন্নি ভাইদের সাথে কথা বলার সুযোগ থাকলে জানতেন, তিনি আরব সুন্নিদের মহাত্রাস। ইরাকি জনমিতির হালনাগাদ তথ্য দেখুন, গত পাঁচ বছরের সুন্নিদের শতাংশ কী হারে কমছে। আইএস নির্মূল কি সেখানে সুন্নি নিধনে পরিণত হয়নি? সোলায়মানি তার ইমাম খামেনীর বিশস্ত সেনাপতি, তার দেশ ইরানের স্বার্থ সংরক্ষক। মধ্যপ্রাচ্যে সাংস্কৃতিক ও সামরিক ইরানের বিস্তারে তার ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু তার চেতনাকে নিখাদ উম্মাটিক চেতনা হিসেবে গণ্য করা দুষ্কর। এমতাবস্থায় তার হত্যাকাণ্ডে খোশ ও নাখোশ যারা হচ্ছেন তাদের ভেবেচিন্তে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা উচিত।

তবে মুসলমানদের লাভ-ক্ষতি কি হলো সেটা তর্কসাপেক্ষ। ট্রাম্পের যে লাভ হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কুড়ির নির্বাচনে তিনি নিশ্চয় এ মহাসাফল্যকে পুঁজি করবেন। অবশ্য এটি নির্ভর করছে ইরানের প্রতিক্রিয়ার ওপর। যা হোক না কেন্ নিকট ভবিষ্যতে ইরান আরেকজন সোলায়মানিকে পাবে, এমন কোনো গ্যারান্টি নেই।

সোলায়মানির মৃত্যুর পরও ইরাকে ইরানের প্রভাব বৃদ্ধির সম্ভাবনা

ইরান একটি শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। এই পরিচয়টুকু এই রাষ্ট্রের জন্য যথেষ্ট নয়। এটি একটি থিওক্রেটিক রাষ্ট্র। এদের লক্ষ্য হলো আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক ইরানকে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় ছড়িয়ে দেয়া।

ইরানের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরাক। এখানেও শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবে প্রায় ২৫ শতাংশ সুন্নির বসবাস। তাছাড়া ইরাকি জনগণ ইরানিদের মতো কট্টর শিয়া আদর্শ ধারণ করত না। এদেশে সাদ্দাম হোসেন নামে এক সুন্নি শাসক ছিলেন। ফলে সৌদি আরব ও ইরানের মাঝে বাফার স্টেটের মতো কাজ করত ইরাক।

কিন্তু ২০০৩ সালে সাদ্দামের পতনের পর অবশ্যম্ভাবী শিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় ইরাকে। যদিও ইরাকি শাসকরা ইরানিদের মত ধর্মনেতা নয়, তবুও জনগণেরও ওপর শিয়া ধর্মনেতা সিস্তানি ও মুকতাদা আল-সদরের প্রভাব অপরিসীম। ফলে সাদ্দামের পর সৌদি আরব সরাসরি একটি শিয়া রাষ্ট্রের সীমানায় চলে যায়।

কালে কালে ইরানি মিলিশিয়াদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয় ইরাক, বিশেষত আইএস এর বিরুদ্ধে ইরানি মিলিশিয়াদের ব্যবহার করার কারণে।

দু’দিন আগে সোলায়মানিকে হত্যার পর ইরাকি শিয়াদের ঐক্য আগের চেয়ে সুদৃঢ় হয়েছে। ইতিপূর্বে ইরাকির সরকারের বিরুদ্ধে শিয়া জনগণই বিক্ষোভ করেছিল। কিন্তু সোলায়মানির মৃত্যু তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ইরাকে দীর্ঘদিন অবস্থান করা সম্ভব নয়। কিংবা ইরাকের সর্বত্র ছড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় সোলায়মানির মৃত্যু ইরাকি শিয়াদের ঐক্য আরো সুদৃঢ় করবে এবং ইরানি প্রভাব বেড়ে যাবে।

বিষয়টি সোলায়মানির মৃত্যুতে আনন্দিত সৌদিদের জন্যও চরম অস্বস্তি বয়ে আনবে। এমনটি হলে সোলায়মানির হত্যার সাফল্য মার্কিনিদের জন্য বুমেরাং হবে এবং ট্রাম্পের সাফল্য ব্যর্থতায় রূপান্তরিত হবে।

লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও সংবাদ

মন্তব্য করুন

Back to top button