মুক্তমত

বঙ্গবন্ধু ও আমার ভাবনা

এখনই সময়  :

১৫ই আগস্ট বাঙালি জাতির জন্য একটি বিভীষিকাময় ও কলঙ্কের দিন। এ দিন একদল বিপদগামী সেনা অফিসার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির মুক্তির কাণ্ডারি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি, বাঙালির জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রাহমানকে তার শিশু পুত্র শেখ রাসেলসহ সপরিবারে হত্যা করেছিল। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় বেঁচে গিয়েছিলেন।

আমি তখন দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। ঢাকাতেই একটি সরকারি কলেজে পড়ি। ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ ঢাকাতেই ছিলাম। সকালে লোকমুখে বঙ্গবন্ধুর হত্যার কথা শুনে মোটেই বিশ্বাস করিনি। সঙ্গে সঙ্গে বসতস্থলে এসে রেডিও চালু করা মাত্রই মেজর ডালিমের কণ্ঠ শুনতে পাই। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমি মেজর ডালিম বলছি। স্বৈরাচার শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর সহায়তায় খন্দকার মুশতাক আহম্মেদ ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন।’ ক্ষণ ক্ষণ বিরতি দিয়ে ঘোষণা বার বার দেয়া হচ্ছিল। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কি করব, কি হবে, কোথায় যাব। বুকটা ভার হয়ে গেল। কান্না আসছিল। রাস্তায় বেরিয়ে দেখি থম থমে অবস্থা। আমি তখন পুরান ঢাকায় থাকতাম। লোকজন সবাই রেডিও শুনতেছিল। অধিকাংশ লোকের মধ্যে আতঙ্ক। কেউ কেউ উৎফুল্লও ছিল। বুঝতে বাকি ছিল না যে, এরা পাকিস্তানপন্থি। স্বাধীনতাবিরোধী। তখন মোবাইল ফোন ছিল না। ল্যান্ডফোনও শহরকেন্দ্রিক সীমিত লোকের ছিল। আমাদের বাড়ি তৎকালীন মাদারীপুর মহকুমার নড়িয়া থানার এক নিভৃত পল্লীতে। বাবা-মা নিশ্চয়ই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে আছেন। পরের দিন অর্থাৎ ১৬ আগস্ট লঞ্চযোগে গ্রামের বাড়ি যাই। আমাকে পেয়ে মা জড়িয়ে ধরল। বললেন, ‘বাবা এসেছিস, আমরা তো খুব চিন্তার মধ্যে ছিলাম। রেডিওতে শেখ সাহেবের মৃত্যুর কথা শুনে তো আমরা প্রথমে বিশ্বাস করি নাই। পড়ে জানলাম এটা সত্য। কেন তাকে মারা হলো। কে মারল। শেখ সাহেবের জন্য এত রোজা রেখেছি যাতে পশ্চিম পাকিস্তানিরা তার কোনো ক্ষতি করতে না পারে। আজ বাঙালিরাই তাকে মেরে ফেলল।’ বাবা বলতেছিলেন, শেখ সাহেব আমাদের স্বাধীনতা দিলেন। সারাটা জীবন জেল খেটেছেন বাঙালির জন্য। আর সে বাঙালিরা তাকে হত্যা করল। যে ব্যক্তি গুলি করল তার হাত কি কাঁপে নাই? এ মহান ব্যক্তিকে কীভাবে গুলি করল। পাকিস্তানিরা ১৯৭১ সালে তাকে মারলে হয়তো আমরা এত কষ্ট পেতাম না। বাঙালিরা কীভাবে এজঘন্য কাজ করল।’ কথাগুলো বলতে বলতে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিলেন। ব্যথায় বুকটা ভারী হয়ে যাচ্ছিল।

এত বড় একটা ঘটনা। জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা। দেশব্যাপী একটা প্রতিবাদের ঝড় ওঠা উচিত ছিল। কিন্তু তেমন কোনো জনবিস্ফোরণ হলো না। সবাই দুঃখ করতেছিল। কষ্ট পাচ্ছিল। দুঃখ করছিল। কিন্তু প্রতিবাদের বিক্ষোভে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেনি। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। ভয়, আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ইত্যাদি কারণে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও মাঠে নেমে আসেননি।

বঙ্গবন্ধুকে কারা হত্যা করল? কেন হত্যা করল? এ প্রশ্নের উত্তর কঠিন নয়। যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি, যারা পাকিস্তানের ভাবধারায় ছিল, পাকিস্তানের মোহ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি, বাংলদেশের অভ্যুদয় যাদের ভালো লাগেনি তারাই মুশতাক-জিয়ার মতো বেইমান ও নব্য রাজাকারদের সমর্থন নিয়ে এ জঘন্য ও নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তাদের সঙ্গে ছিল বহিঃশক্তির ষড়যন্ত্র। বঙ্গবন্ধুর অপরাধ কী? বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। জীবনে অনেক ত্যাগ, কষ্ট ও অত্যাচার সহ্য করে, যৌবনের স্বর্ণালি দিনগুলো কারা প্রকোষ্ঠে কাটিয়ে আপসহীন সংগ্রামের মাধ্যমে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে বাঙালিদের একটি স্বাধীন ভূখণ্ড উপহার দিয়েছিলেন। বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের একটি পতাকা দিয়েছিলেন। এটাই কি তার অপরাধ? হ্যাঁ,পাকিস্তানপন্থিরা পাকিস্তান হারিয়ে বঙ্গবন্ধুকে সহ্য করতে পারেনি। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি এ দেশের কিছুসংখ্যক বিশ্বাসঘাতক ও কুলাঙ্গারের সহায়তায় ইতিহাসের এ নির্মম, বর্বর, অমানবিক ও জঘন্য হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। হায়নাদের কবল থেকে রেহাই পায়নি রাসেলের মতো ছোট শিশু। মায়ের কাছে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু দানবরা বুলেট দিয়ে তার বুক ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল। রেহাই পায়নি নববধূ, রেহাই পায়নি অন্তঃসত্ত্বা মা, রেহাই পায়নি বঙ্গমাতা যিনি আন্দোলন সংগ্রামে সারাটা জীবন জাতির পিতাকে সাহস ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন এবং ব্যক্তিগত সুখ-শান্তি বিসর্জন দিয়ে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের সূচনা লগ্ন থেকেই মোশতাক ও জিয়াউর রহমানের অস্বচ্ছ ও উচ্চবিলাসী আচরণ পরিলক্ষিত হয়েছিল। মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম (বীরউত্তম), সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক আলোচনায় বলেছিলেন ২৬ মার্চ, ১৯৭১ মেজর জিয়া চট্টগ্রাম সোয়াত জাহাজ থেকে পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র নামাতে চেয়েছিলেন। তাদের বাঁধায় তিনি তা পারেননি। বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে ০০:৩০ মিনিটে গ্রেফতারের পূর্বে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম যায় চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের নেতারা মাইকে তা প্রচারের ব্যবস্থা নেন। একটি সাক্ষাৎকারে চট্রগ্রামের এক আওয়ামী লীগ নেতা বলেছিলেন, আওয়ামী লীগের চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি আবদুল হান্নান কালুর ঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করেন। তিনি মেজর জিয়াকে ওই ঘোষণা পাঠ করার জন্য অনুরোধ করেন যাতে সেনা সদস্যরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে না থেকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মেজর জিয়া ঘোষণাপত্রটি তার নিজের স্টাইলে পাঠ করলেন যা নিয়ে এখন বিতর্ক চলছে। এম আর আক্তার মুকুল যিনি স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে চরমপত্র পাঠ করতেন তিনি একবার চাঁদপুরে বিজয়মেলায় আলোচনা সভায় বলেছিলেন, মেজর জিয়া মুজিবনগর সরকারের এক সভায় প্রস্তাব করেন যে, ডধৎ পড়ঁহপরষ করে যুদ্ধ পরিচালনা করা হোক। তখন সবাই তার বিরোধিতা করেন। নিবাচিত প্রতিনিধিরা বলেন, ‘নির্বাচিত সরকার যুদ্ধ পরিচালনা করছে। ডধৎ পড়ঁহপরষ-এর কি প্রয়োজনীয়তা আছে?’ মুক্তিযুদ্ধের সূচনা লঘ্ন থেকেই মেজর জিয়া বিতর্কিত ও রহস্যজনক আচরণ করতেন এবং খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে তার সুস¤পর্ক ছিল। মোশতাকের আচরণও রহস্যবৃত ছিল। অনেকেই বিশ্বাস করতেন মোশতাক আমেরিকার সিআইয়ের এজেন্ট। বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্যে দিয়ে মোশতাক ও জিয়ার আসল রূপ জাতির কাছে উন্মোচিত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দেয়নি। তারা প্রকাশ্যে পাকিস্তানকে সমর্থন ও সাহায্য সহযোগিতা দিয়েছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালিদের নির্বিচারে গণহত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন করছিল। বাড়ি-ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল। পাকিস্তানিদের নির্যাতনে এক কোটি লোক দেশ ত্যাগ করে ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল। বাংলার স্বাধীনতাকামী জনতা পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার জন্য তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে প্রতিরোধ করছিল। মুক্তিযুদ্ধ চলছিল। তা জেনেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তথা বাংলার স্বাধীনতাকামী জনতার বিপক্ষে অবস্থান নেয়। বাঙালির বিজয় তারা মেনে নিতে পারেনি। তারা এদেশের কিছু স্বার্থান্বেষী মহলকে অর্থের বিনিময়ে তাদের তথাকথিত সমাজতন্ত্রের তত্ত্বে উদ্বুদ্ধ করে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি, পূর্ব পাকিস্তানের সর্বহারা পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) নামে উগ্র রাজনৈতিক প্লাটফর্ম তৈরি করে। বিদেশিদের হাতের পুতুল হয়ে তাদের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এসব উগ্র গোষ্ঠী একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত নতুন শিশু রাষ্ট্রের সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। গেরিলা যুদ্ধের আদলে তারা পুুলিশ হত্যা, সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতাদের হত্যা, থানা লুট, ফাঁড়ি লুট, অস্ত্র লুট ইত্যাদি নাশকতার মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায়। মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক ছড়ায়। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শত্রুরা গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের অবাধ স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে নানা ষড়যন্ত্রমূলক ও মিথ্যা সংবাদ ও প্রতিবেদন প্রকাশ করে জনমনে বিভ্রান্ত সৃষ্টি করে সরকারের জনপ্রিয়তার হ্রাস করার চেষ্টায় লিপ্ত হয়। মোট কথা মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত দেশি-বিদেশি শত্রুরা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। আওয়ামী লীগের কিছু নেতার দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারও শত্রুদের ষড়যন্ত্রের জালকে কিছুটা হলেও শক্তিশালী করেছিল।

মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তি এবং দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহল ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশের মধ্যে যে অরাজকতা চালাচ্ছিল তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য এবং দেশের উন্নয়ন ও শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে এবং শিল্প ও ক্ষেত-খামারে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে দি¦তীয় বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল সমগ্র জাতিকে একত্রিত করে দেশের অগ্রগতি, উন্নয়ন, শান্তি এবং দারিদ্র্য ও বৈষম্যমুক্ত অসাম্প্রদারিক বাংলাদেশ গঠনের জন্য এক প্লাটফর্মে (বাকশাল) কাজ করার পরিবেশ তৈরি করা। তিনি ধনিক শ্রেণির গণতন্ত্রের পরিবর্তে শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাদের ভাগ্যোন্নয়ন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতা বিরোধীরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করে ঐক্যবদ্ধ জাতিসত্তার উন্মেষ এবং দেশের অগ্রযাত্রাকে নস্যাৎ করার উদ্দেশ্যেই জাতির পিতাকে হত্যা করেছিল।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী মহল নানাভাবে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও অপপ্রচার চালিয়েছে। খলনায়ককে আসল নায়কের চরিত্রে বসানোর প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু এদেশের মানুষ তা মেনে নেয়নি। এটাই ইতিহাসের বাস্তবতা। ইতিহাস তার আপন মহিমায় ইতিহাসের নায়কদের মূল্যায়ন করে থাকে। আজ বঙ্গবন্ধু তার আপন মহিমায় বাঙালিদের মধ্যে বেঁচে আছন। তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল যতদিন এ দেশ ও বাঙালি জাতি টিকে থাকবে এ ভূখণ্ডে। তাই অন্নদা শঙ্কর রায় লিখেন-

‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান

ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।

দিকে দিকে আজ অশ্রুমালা রক্তগঙ্গা বহমান,

তবু নাই ভয় হবে হবে জয়, জয় মুজিবুর রহমান।’

বঙ্গবন্ধুর এ জয় বাঙালির জয়। এ জয় চিরঞ্জীব, চির বহমান। এ জয় ইতিহাসে আভা ছড়াবে চিরদিন। স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালি জাতিসত্তাকে নস্যাৎ করে এ দেশের সমাজ-সংস্কৃতিকে পাকিস্তানি ভাবধারায় রূপান্তর করতে চেয়েছিল। কিন্তু জনগণ তা মেনে নেয়নি। তাদের পরাজয় হয়েছে। কিন্তু তারা দেশের অগ্রযাত্রাকে পিছিয়ে দিয়েছে অনেক অনেক বছর। পুনর্বাসিত করেছে রাজাকারদের। ভূলুণ্ঠিত করেছিল বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে।

পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতনামা লেখক নিরঞ্জন মজুমদার ১৯৭১ সালে ‘বঙ্গবন্ধু ও রক্তাক্ত বাংলা’ শীর্ষক এক নিবন্ধে লিখেছিলেনÑ

‘দেশে দেশে নেতা অনেকেই জন্মান, কেউ ইতিহাসের একটি পঙ্ক্তি, কেউ একটি পাতা, কেউ বা এক অধ্যায়। কিন্তু কেউ আবার সমগ্র ইতিহাস। শেখ মুজিব এই সমগ্র ইতিহাস। সারা বাংলার ইতিহাস। বাংলার ইতিহাসের পলিমাটিতে তার জন্ম। ধ্বংস, বিভীষিকা, বিরাট বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে সেই পলিমাটিকে সাড়ে সাত কোটি মানুষের চেতনায় শক্ত ও জমাট করে একভূখণ্ডকে শুধু তাদের মানসে নয়, অস্তিত্বের বাস্ততায় সত্য করে তোলা এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব। মুজিব মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে মৃত্যুঞ্জয় নেতার মতো ঐতিহাসিক ভূমিকা গ্রহণ করেছেন, দায়িত্ব পালন করেছেন।’

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দেশে ও বিদেশে বিশিষ্টজনরা নানাভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্বের শোষিত মানুষ হারাল তাদের একজন মহান নেতাকে, আমি হারালাম একজন অকৃত্রিম বিশাল হৃদয়ের বন্ধুকে।’

হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মতো তেজী এবং গতিশীল নেতা আগামী বিশ বছরের মধ্যে এশিয়া মহাদেশে আর পাওয়া যাবে না।’

নোবেল বিজয়ী উইলিবান্ড বলেন, ‘মুজিব হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না, যারা মুজিবকে হত্যা করেছে তারা যেকোনো জঘন্য কাজ করতে পারে।’

ইয়াসির আরাফাত বলেন, ‘আসসহীন সংগ্রামী নেতৃত্ব আর কুসুম কোমল হৃদয় ছিল মুজিব চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।’

ব্রিটিশ এমপি জেমসলামন্ড বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে শুধু বাংলাদেশ এতিম হয়নি, বিশ্ববাসী হারিয়েছে তার মহান সন্তানকে।’

বঙ্গবন্ধুকে চতুর্দশ লুইয়ের সঙ্গে তুলনা করে পশ্চিম জার্মানির এ পত্রিকা লিখেছিল, জনগণ তার কাছে এত প্রিয় ছিল যে লুইয়ের মতো তিনি এ দাবি করতে পারেন ‘আমিই রাষ্ট্র’।

আরও অনেক বিশ্বনন্দিত ব্যক্তিবর্গ বঙ্গবন্ধু সম্বন্ধে অনেক মন্তব্য করেছেন। বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলাদেশের নেতাই ছিলেন না, দেশের সীমানা পেরিয়ে বহিঃবিশ্বে তার একটি মহান ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল। তিনি হয়েছিলেন বিশ্ব বরেণ্য নেতা। বিশিষ্টজনের মন্তব্যে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অথচ একদল বিশ্বাসঘাতক বাঙালি এ মহান ব্যক্তিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এ শোক, এ দুঃখ, এ গ্লানি, এ কলঙ্ক কোনো দিনও মুছবে না। এ লজ্জা লুকাবার কোনো পথ নেই। এ শোকে বাঙালি কাঁদবে, আরও কাঁদবে, অনন্তকাল কাঁদবে।

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বাঙালিদের কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না। তার সে বাণী বাস্তবে প্রমাণিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য তনয়া শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সোনার বাংলা বিনির্মাণে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকরা যতদিন বেঁচে থাকবে, যতদিন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থাকবে, ততদিন এদেশের অগ্রযাত্রা আর কেউ দাবিয়ে রাখতে পারবে না। বাংলাদেশ হবে বিশ্বের একটি ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, সমৃদ্ধশালী, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক দেশ। এভাবেই বাস্তবায়ন হবে জাতির পিতার স্বপ্ন। শোকের মাসে গভীর শ্রদ্ধা জানাই মহাকালের মহাপুরুষ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে বাঙালিদের ললাটে যে কলঙ্কের কালিমা লেপন করা হয়েছিল তা মুছে ফেলা সম্ভব না হলেও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সোনার বাংলা তৈরি করে তার আত্মাকে শান্তি দেয়া যায়- যা তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা করছেন। আমাদের সবারই অঙ্গীকার হোক সোনার মানুষ হয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা তৈরির।

লেখক: পুলিশের সাবেক আইজিপি

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
Close