ব্যবসা

‘ত্রি মিলিয়নিয়ার পোর্টে’র তালিকায় যোগ হলো চট্টগ্রাম বন্দর

বিশ্বের ৬০টি সমুদ্রবন্দর আছে যারা বছরে ৩০ লাখ বা ৩ মিলিয়ন একক কন্টেইনার উঠানামা করে। সেই ‘ত্রি মিলিয়নিয়ার পোর্ট’ এর তালিকায় এবার যোগ হলো দেশের প্রধান চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের নাম।

আজ শনিবার চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ৩০ লাখ একক কন্টেইনার উঠানামার নতুন রেকর্ড গড়েছে। ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে গত ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই পরিমাণ কন্টেইনার উঠানামা হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে। ২০১৯ সাল পূর্ণ হতে এখনও ১০ দিন বাকি আছে; তার আগেই তালিকায় নাম লেখালো চট্টগ্রাম বন্দর।

উল্লেখ্য, বিশ্বসেরা একশ সমুদ্রবন্দরের তালিকায় এখন চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ৬৪তম। ২০১৮ সালে ২৯ লাখ একক কন্টেইনার উঠানামার বিবেচনায় এই অবস্থান অর্জন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। এর আগে ২০১৭ সালে এই বন্দরের অবস্থান ছিল ৭০ তম। শিপিং বিষয়ক বিশ্বের সবচে পুরণো সাময়িকী ‘লয়েডস লিস্ট’ এই তালিকা তৈরি করে প্রকাশ করে প্রতিবছর। সেই তালিকায় ৬০টি সমুদ্রবন্দর আছে; যারা বছরে ৩০ লাখ মিলিয়নের বেশি কন্টেইনার উঠানামা করে। আর চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ৬৪ তম হলেও ত্রি মিলিয়নিয়ার পোর্ট হিসেবে বিবেচিত হতো না।

বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম বন্দর সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং ব্যবহারকারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই মাইলফলক অর্জন সম্ভব হয়েছে। সীমাবদ্ধতা ও অনেকগুরো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই আমরা ৩০ লাখ একক হ্যান্ডলিং করতে সক্ষম হয়েছি। বিশ্বের সেরা ও ব্যস্ততম বন্দরগুলোর সাথে আমাদের চট্টগ্রাম বন্দরকে মিলানো যৌক্তিক হবে না। কারণ সেখানে বেশিরভাগ বন্দরই ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর; আমাদের মতো ‘এন্ড পোর্ট’ বা শেষ গন্তব্য নয়।

তিনি বলেন, এখনও যদি আমরা বন্দর থেকে ডেলিভারি দেয়া স্থানান্তর করে বে টার্মিনালে নিতে পারি তাহলে আরও বেশি সফলতা দেখাতে পারবো। লয়েডস লিস্টে আরও সামনের সারিতে থাকতে পারবো।

বিশ্বের ত্রি মিলিয়নিয়ার ক্লাবের বন্দরে চট্টগ্রাম বন্দর যুক্ত হওয়া অবশ্যই গৌরবের উল্লেখ করে গ্যালাক্সি বাংলাদেশ শিপিং লাইনসের চেয়ারম্যান আহমেদ ইউসুফ ওয়ালিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, এতে বিশ্বে সমুদ্রবন্দরে চট্টগ্রাম বন্দর সাথে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে। আমাদের উচিত হবে প্রবৃদ্ধি সামাল দেয়ার সক্ষমতা তৈরি করা এবং এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করে বন্দরের দক্ষতা আরও বাড়ানো। কারণ বন্দরের দক্ষতার ওপর পুরো বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকখানি নির্ভরশীল।

জার্মানির হামবুর্গ পোর্ট কনসালটেন্সি (এইচপিসি) প্রণীত চট্টগ্রাম বন্দরের ৩০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, চট্টগ্রাম বন্দরে ২০১৮ সালে কন্টেইনার উঠানামা হবে প্রায় ২৪ লাখ একক; ২০১৯ সালে হবে ২৬ লাখ ৬৬ হাজার একক এবং ২০২০ সালে হবে ২৯ লাখ একক কন্টেইনার। আড়াই বছর পরের সেই পূর্বাভাস বা লক্ষমাত্রা বিগত ২০১৭ সালেই পুরণ করেছে চট্টগ্রাম বন্দর।

মহা পরিকল্পনায় আভাস দেয়া হয়েছে, পণ্য উঠানামার প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে নতুন জেটি টার্মিনাল ও যন্ত্রপাতি যোগ করতে হবে। অন্যথায় পণ্য উঠানামার কাজ অন্যত্র সরিয়ে নিতে। আর এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে বন্দরের প্রবৃদ্ধি কমবে। অর্থ্যাত্ পণ্য ছাড়াতে এখনকার চেয়ে বাড়তি সময় লাগবে। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত নতুন ও আধুনিক যন্ত্রপাতি যোগ করে পণ্য উঠানামা সামাল দিয়েছে ঠিকই কিন্তু ২০২০ সালের মধ্যে নতুন টার্মিনাল বা জেটি না আসলে বন্দরের এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কোনভাবেই সম্ভব হবে না।

বন্দর কর্মকর্তারা বলছেন, প্রবৃদ্ধি সামাল দিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্ণফুলী নদীর পাড়ে পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) নির্মাণ করছে। ২০১৯ সালে সেটি চালুর কথা ছিল, দ্রুত চালুর জন্য সেনাবাহিনীকে দিয়ে কাজ করাচ্ছে সরকার। কিন্তু সেই প্রকল্পও ২০২০ সালের আগে চালুর কোন সম্ভাবনা নেই। নতনু কোন জেটি-টার্মিনাল আগামী দুবছরেও বন্দরে আসবে না। ফলে বন্দরের জন্য ২০২০ সাল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বন্দর চাইছে এই মুহুর্তে বে টার্মিনালে শুধুমাত্র ডেলিভারি ইয়ার্ড ও একটি ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ করতে। কিন্তু মন্ত্রনালয়ে আটকা পড়েছে সেই ফাইল।

চট্টগ্রাম বন্দরের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে না পারলে দেশের অর্থনীতিও চাপে পড়বে, এর খেসারত দিতে হবে আমদানি-রপ্তানিকারকদের। বন্দর সঠিকভাবে কাজ না করলে বিশ্ব রপ্তানির বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশ।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, এটা শুধু চট্টগ্রাম নয়, পুরো দেশের অর্থনীতির জন্য দুভার্গ্যের। কারণ সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারনী ফোরামে জানানোর পরও বে টার্মিনাল নির্মানকাজে দৃশ্যত অগ্রগতি হয়নি। নির্মান শুরু দুরে থাকা বালি ভরাট পর্যন্ত হয়নি। তাহলে ডেলিভারি ইয়ার্ড, ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ হবে কখন?

কী কারণে বন্দরের সবচে গুরুত্বপূর্ণ ‘বে টার্মিনাল প্রকল্প’ প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পভূক্ত ফাস্ট ট্র্যাকে নেয়া হচ্ছে না আমরা জানতে চাই-যোগ করেন তিনি।

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
Close