জাতীয়মুক্তমত

শাল বনকে প্রতিনিয়ত ধর্ষন করেই যাচ্ছে

  • সাইদুর রহমান রিমন :

মধুপুর শাল গজারি বনের লাইভ ভিডিও ছেড়েছে ফেসবুকের পাতায়। সেখানে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহের পিচঢালা রাস্তার দু’পাশে সারি সারি শাল গজারি গাছের চিরাচরিত রুপ দেখে মুগ্ধ হলাম। লাইভেই দেখতে পেলাম টেলকীর কাছাকাছি এলাকায় অনেকগুলো ভ্যান বোঝাই করে শাল গজারির পাতা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একদা আমিও বন পরিচ্ছন্ন করে ঝাড়– দিয়ে পাতা কুড়িয়ে নিয়ে যাওয়া মানুষজনকে বাহবা জানাতাম। ভাবতাম, লোকগুলো দূর দূরান্ত থেকে গিয়ে কত পরিশ্রম করে বন পরিচ্ছন্ন করে রাখছে। কিন্তু ভুল ভেঙ্গেছে ডিএফও তপন বাবুর কথায়। তিনি বলছিলেন, প্রকৃতির এক অমোঘ সৃষ্টি হচ্ছে শাল গজারির বন। এর চারা বপন করা যায় না, গাছ এক স্থান থেকে তুলে অন্যস্থানে লাগিয়েও তা বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। বাংলাদেশ ও ভারতীয় ভ‚খন্ডের কিছু এলাকা ছাড়া শাল গজারি বনের অস্তিত্বও পৃথিবীর কোথাও নেই। অত্যন্ত কম ব্যসার্ধের মধ্যেই অনেক উচু উচু হয় এ শক্ত সামর্থের গাছগুলো। পরিপক্ক গাছ কেটে নেয়া হলে তার আশপাশে আপনা আপনিই ২০/২২টি করে চারা গজিয়ে উঠে। শাল গজারি বনের একমাত্র সম্প্রসারণ প্রক্রিয়াই এটি। ডিএফও তপন চন্দ্র বলছিলেন, এ মৌসুমে শাল গজারির সব পাতা ঝরে পড়ে। বৃষ্টিতে সেসব পাতা পচে উর্বর হয়ে উঠে গাছের তলা। সেখানেই গজারির ফুল থেকে এক ধরনের বিচি খসে পড়ে নিচে। পাতা পচা স্যাতস্যাতে জায়গায় সে বিচি থেকেই জন্ম নেয় গজারির চারা, বেড়ে ওঠে তা। কিন্তু পাতাগুলো ঝাড়– দিয়ে বস্তা ভরে ভরে বনের বাইরে নিয়ে যাওয়ার কারণে গজারি ফুল বিচি নিচের শক্ত পোক্ত মাটিতে পড়লেও চারা গজানোর আর কোনো উপায় থাকে না। ফলে গত আড়াই যুগ, তিন যুগ থেকেই মধুপুর কিংবা ভাওয়াল শাল গজারি বনের সম্প্রসারণ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। বরং গাছ চুরি আর শেকড়সহ তা উপড়ে ফেলার ঘটনা বেড়েই চলছে দিন দিন। এসব কারণে প্রায় নিঃশেষ হতে চলেছে ঐতিহ্যবাহী শাল গজারির বন, এখন শুরু হচ্ছে বনভ‚মি কেনাবেচার বাধাহীন দৌরাত্ম্য…..

মধুপুর গড়ে বন কর্মকর্তা আছেন, বনরক্ষী আছেন, বন আইনসহ নিয়ম কানুন সবই আছে, শুধু কার্যকর পদক্ষেপ নেন না তারা। তা না হলে প্রকাশ্যে বন থেকে শত শত ভ্যানযোগে নিত্যদিন পাতা কুড়িয়ে নেয়া হয় কিভাবে? বোধকরি বন ধ্বংস করে শিগগির বনভূমির পজিশন বিক্রি করাটাই তাদের উদ্দেশ্য রয়েছে। ইতিমধ্যেই মধুপুর গড়ের বহু এলাকা চাষবাস ও বসবাসের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বনায়ন করার কথা। কিন্তু বনভ‚মি বরাদ্দ নিয়েই মানুষজন সেখানে আনারস, পেপে, লেবুর বাগান গড়ে তুলছে। বনায়ন করছেন না কেউ। চুক্তির শর্ত ভঙ্গের জন্য কারো বনভূমি বরাদ্দ বাতিল হওয়ারও কোনো নজির নেই। ধারাবাহিক ভাবেই মধুপুর বনের উপর সীমাহীন জিঘাংসা দেখানো হচ্ছে এভাবেই। মধুপুর গড় এলাকার অধিবাসী আমার আরেক ছোট ভাই বাবুল নকরেক ‘ধর্ষিতা শালবন’ নামে একটি বই লিখতেও বাধ্য হয়েছিল। আসলেই আমরা সবাই মিলে শাল গজারির বনটাকে গণধর্ষণ করেই ছাড়ছি…..

আরও সংবাদ

Back to top button