মুক্তমতলাইফষ্টাইল

বখিলা

ইলিশ ভাগাদর এর গল্প

বখিল।

 

মোঃ মনিরুল ইসলাম।

২৮.১০.২০২০, ৫:০০ পিএম, খুলনা।

 

সে কালে চল্লিশ টাকায় একটা বড় সাইজের ইলিশ পাওয়া যেত হরহামেষা। হাট বাজারে রুই কাতলা বা ইলিশ কেটে ভাগা দরে বেচাকেনার প্রচলনও ছিল ফলে অতি দরিদ্র বা নিম্ন আয়ের লোকেরাও মৌসুমে ইলিশের স্বাদ নিতে পারত।

 

আমাদের গ্রামের ধনাকাকা পুরো নাম ধনেন্দ্র নাথ দত্ত হলেও লোকে ধনাকাকা বলেই ডাকত। তিনি সমাজ মানলেও সামাজিকতার ধার তেমন একটা ধারতেন না। সমাজ তাকে কৃপন বলে থাকলেও নিজেকে তিনি মিতব্যয়ী বলে দাবি করতেন। বাড়তি যে কোন খরচপাতি থেকে নিজেকে তিনি আড়ালে আবডালে রাখতেন। চার ফুট দশ ইঞ্চি উচ্চতার মানুষটার সর্বসাকুল্যে ওজন সাড়ে বিয়াল্লিশ কেজির অধিক হবে না বলে লোকমুখে গুঞ্জন ছিল। অনেকে আবার তামাসা করে বলতো দুইশ ছয়খানা হাড্ডি বাদ দিলে উনার ওজন বাইশ কেজির বেশী হবে না! না খেয়ে না পরেই তার এই হাল। সহায় সম্পত্তির হিসাবে খুব বড় লোক না হলেও মধ্যবিত্ত বলা চলে অনায়াসেই কিন্তু খরচের ভয়ে তিন বেলার জায়গায় দুই বেলা আহারের অভ্যাস গড়ে তুলেছিলেন ছেলে মেয়েদের মধ্যে। বাড়ির পাশের শাক সব্জি কচু ঘেচু ছিলো নিত্যদিনের খাবারের মেন্যু। কালে ভদ্রে তিনি বাজারে যেতেন ভাগাদরের মাছ কিনতে।

 

কড়া নিয়মের বেড়াজাল টপকে ব্যতিক্রম কিছু করার সাহস তার পুত্র কন্যাদের ছিল না। এমনকি নিজেদের কোন স্বাদ আহ্লাদ ব্যক্ত করার দুঃসাহস কোন দিন দেখাতে পারত না তারা। স্ত্রী, সন্তানের মায়ার চেয়ে টাকার মায়া তার কাছে অধীক সমীচিন। স্ত্রীর চিকিৎসায় অধীক টাকা খরচ করার চেয়ে দুইকানি জমিজেরাত খরিদ করা উত্তম মনে করে স্ত্রীর ভার বিধাতার উপরে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিত হয়ে বসে রইলেন। ছয় মাস রোগের সাথে লড়াই করে এক সন্ধ্যায় পরোলোকগতা হয়ে বিধাতার কাছেই ফিরে গেলেন তিনি।

 

মৃত বাড়িতে সমাজের লোকজন, প্রতিবেশীরা জড়ো হয়ে শেষকৃত্য অনুষ্ঠান আয়োজনে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন সবাই। শব যাত্রার প্রাক্যালে সমাজপতিদের অনুরোধে পরোলেকগতা স্ত্রীর কোন দায়দেনা আছে কি না জানতেে চাইলে কেউ কোন দাবি দাওয়া পেশ না করলেও প্রতিবেশী এক জেলে হঠাৎ বলে উঠল মৃতার নিকট তার দশ টাকা পাকা পাওনা আছে।

 

শোকে বিহবল ধনাকাকা অধীক শংকায় আৎকে উঠে জানতে চাইলেন সেই দশ টাকা কিসের দেনা ছিলেন তার স্ত্রী যে কিনা কোনদিন বাড়ির বাইরে যাননি!

 

জেলে বলে উঠলেন এক ভাগা ইলিশ মাছের দাম বাবুু।

এই তো গত বছর আপনি যে এক ভাগা (চার টুকরা) ইলিশ মাছ কিনে আপনার স্ত্রীকে সোয়াদ করে রান্না করতে বলেছিলেন মনে আছে হয়তো আপনার।

 

হ্যা সে মাছ তো আমি কিনেছিলাম আমার স্ত্রী তো নয়?

 

জ্বি হ্যা, আপনার স্ত্রী সোয়াদ করে রান্না করে খাওয়ার সময় যখন আপনার সামনে দিল তখন আপনি মাছ রেখে শুধু মাছের ঝোল দিয়েই খেয়ে নিলেন।

 

বউদিকে বললেন পরের দিন আবার পানি গরম করে মাছের মধ্যে দিয়ে সেই  তরকারি আবার দিতে।

 

এই ভাবে পর পর তিন দিন মাছের ঝোল খাবার পরে চতুর্থ দিনের জন্য রেখে দেয়া সেই মাছ একটা হুলো বিড়ালে খেয়ে ফেললে আপনার স্ত্রী পড়ে গেলেন বিপদে। পরের দিন যদি মাছ আপনার সামনে দিতে না পারে তবে নাকি আপনি তাকে আস্ত রাখবেন না, এই ভয়ে তিনি আমার কাছে যেয়ে ঘটনা বললে আমি উনাকে বাকিতে এক ভাগা ( চার টুকরা) মাছ দিয়েছিলাম। সেই মাছের দাম দশ টাকা আমার পাওনা আছে বাবু!

 

দশ টাকার চিনতায় অতিশয় শংকিত ধনাকাকা মাথাটা ঈষৎ নীচু করে বললেন আপনি যদি দয়া করে সেই দশটা টাকা ক্ষমা করে না দেন, তবে যে আমার পরলোকগতা স্ত্রীর মুক্তি মিলবেনা দাদা।

 

দয়া করে ক্ষমা করে দিন তাকে!!!

Related Articles

Back to top button
Close