সারাদেশ

১২ বছর পর কারামুক্তি পেয়ে ৩ বছর শিকলবন্দি ফুল মিয়া!

এখনই সময় :

নেত্রকোনার দুর্গাপুরে ৩ বছর ধরে শিকলবন্দি অবস্থায় ঘরে বন্দি আছেন ফুল মিয়া (৬০) নামের এক বৃদ্ধ। বাকলজোড়া ইউনিয়নের পিপুলনারী গ্রামে মাথায় সমস্যার কথা বলে তিন বছর ধরে একটি রুমের নির্জন কক্ষে পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে ওই বৃদ্ধকে। গত বুধবার (১ জুলাই) দুপুর ১টার দিকে ওই আবদ্ধ রুমে শিকলবন্দি অবস্থায় এ বৃদ্ধকে দেখা গেছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার বাকলজোড়া ইউনিয়নের পিপুলনারী গ্রামে বৃদ্ধ ফুল মিয়াকে তিন বছর ধরে একটি নির্জন কক্ষে আবদ্ধ রাখা হয়েছে। আটক করে রাখা বৃদ্ধের খোঁজ নিতে ওই বাড়িতে প্রবেশ করে সাংবাদিকদের একটি টিম। তাঁদের উপস্থিতি টের পেয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করেন অভিযুক্ত সুরুজ আলী।

শিকলবন্দি ফুল মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, আমার কথাটি আপনারা মনযোগ দিয়ে শোনেন। আমি কোনো পাগল না। আমি সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষ। আমাকে শিকলবন্দি করে পাগল বানানোর নাটক করা হচ্ছে। আমাকে পাগল বানিয়ে ঘরবন্দি করে রেখেছে সুরুজ আলী, মাওলানা রফিকুল ইসলাম। এ ছাড়াও আরো ৩/৪ জনের নাম উল্লেখ করে পুরো ২৫ মিনিট কথা বলেন তিনি। শিকলবন্দি দশা থেকে মুক্তি পেতে সাংবাদিকদের মাধ্যমে উপজেলা ও পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করছেন বৃদ্ধ ফুল মিয়া।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফুল মিয়া মাটির নিচ থেকে প্রায় সতের বছর পূর্বে (ধাতব জাতীয়) মূল্যবান একটি পাথর খুঁজে পান। সেটি ২০০৩ সালে চৈত্র মাসের শুরুর দিকে। পাথরটি তাঁর স্ত্রীর কাছে দেন লুকিয়ে রাখতে। ফুল মিয়া ওই পাথরটি বিক্রি করতে পার্টির খোঁজে বের হন। বাড়ি এসে স্ত্রীর কাছে পাথরটি চাইলে, তখন তার স্ত্রী বলে উঠে পাথরটি সুরুজ মিয়া ও মাওলানা রফিকুল ভাইয়ের কাছে ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন। এ কথা শুনে উত্তেজিত হয়ে স্বামী ঘরে থাকা বটি দিয়ে স্ত্রীকে গলায় কোপ দেয়। ঘটনাস্থলেই স্ত্রী ফাতেমা খাতুন মারা যান। ২০০৩ সালের বৈশাখ মাসের ৬ তারিখ এ হত্যার ঘটনা ঘটে বলে জানান বৃদ্ধের পুত্র আবু হানিফা। খবর পেয়ে পুলিশ ফুল মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। নিহতের ভাই বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। এ মামলায় ১২ বছর ৫ মাস ১৭ দিন জেল খাটে ফুল মিয়া। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে দীর্ঘদিন এলাকায় ঘোরাফেরা করে। পরে পাথর বিক্রি দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে অনেকের সাথে বলাবলি করলে ক্ষেপে যান সুরুজ মিয়া ও রফিকুল ইসলাম। এরই জের ধরে ফুল মিয়ার পুত্রদের অসহায়ত্বের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পিতাকে শিকলবন্দি করে রাখার মত দেন সুরুজ আলী ও রফিকুল ইসলাম। হঠাৎ করে ঘরে বন্দি করে দুই পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখে ফুল মিয়াকে। শিকলবন্দি ৩ বছরেও আলোর মুখ দেখেননি এ বৃদ্ধ।

শিকল বন্দি ফুল মিয়া জানান, মাওলানা রফিক ও সুরুজ আলীর এক সময়ে দিন আনতে পানতা পুরাইতো। এখন শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। ওই ধাতব জাতীয় পাথর বিক্রি করে আজ শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। ওরা আমার সন্তানদেরকে পুষ্য বানিয়ে আমাকে পাগল বানিয়ে রাখছে। আমি এ শিকলবন্দি থেকে মুক্তি পেতে চাই।

ফুল মিয়ার দুই ছেলে এক মেয়ে রয়েছে। বৃদ্ধের পুত্র আবু হানিফা সাংবাদিকের এক প্রশের জবাবে এ প্রতিবেদককে জানান, বাবার মাথায় সমস্যা থাকার জন্যে একঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছে। গত ৩ বছর ধরে ঘরের খাটের সঙ্গে শিকল দিয়ে দুই পায়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। শিকল বাঁধা অবস্থায় ঘর থেকে বারান্দা পর্যন্ত চলাচল করতে পারে। ওই নির্জন কক্ষের ভিতরেই পায়খানা-প্রসাব করেণ তিনি। খাওয়া দাওয়া, ঘুমানো সবই চলে ঘরের ভিতরে। মানসিক রোগী (মাথায় সমস্যা) এ ব্যাপারে কোন চিকিৎসার প্রেসক্রিপশন আছে কিনা আবু হানিফের কাছে জানতে চাইলে কোন উত্তর মেলেনি।

এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকের জানান, ফুল মিয়া মূলত পাগল না। তাঁকে শিকল বন্দি করে রাখা হয়েছে। এটা অমানবিক ঘটনা। তাঁকে বন্দিদশা থেকে উদ্ধার প্রশাসনের লোকদের এগিয়ে আসা উচিত বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।

ফুল মিয়াকে আটকের ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাইলে সুরুজ আলী বলেন, আপনারা এলাকার মানুষ সবাই আমাকে চিনেন। আমি উনার কাছ থেকে পাথর কিনে অন্যত্র বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছি সেটি মিথ্যা কথা। আর আমি তাকে শিকলে আটকে রাখতে বলিনি।

অভিযুক্ত মাওলানা রফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, আমি তাকে শিকলবন্দি করে রাখতে যাবো কেন। এমনকি কোনো মূল্যবান পাথর কেনার সাথে জড়িত ছিলাম না।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা খানম বলেন, ওই বৃদ্ধকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে শিকল বন্দি বৃদ্ধকে অচিরেই উদ্ধার করা হবে।

 

Related Articles

Back to top button
Close