ধর্ম

পানি থেকে প্রাণ খোদার দান

এখনই সময় :

মহান আল্লাহ বলেন,

আর আমি আসমান থেকে বরকতময় পানি বর্ষণ করেছি। অতঃপর তা দ্বারা আমি উৎপন্ন করি বাগ-বাগিচা ও কর্তনযোগ্য শস্যদানা।

(সুরা : ক্বাফ, আয়াত : ৯)

ইসলাম জীবন সম্পর্কে হাজার বছর আগে মূল্যবান ধারণা দিয়েছে। পৃথিবীর যাবতীয় সম্পদ অর্জন ও ব্যবহার সম্পর্কে ইসলামের রয়েছে সুন্দর ও বাস্তবধর্মী নির্দেশনা। আর পরিবেশ সম্পর্কে রয়েছে ইসলামের সুস্পষ্ট বক্তব্য। তেমনি জীবন ও জীবন নির্বাহে পানির গুরুত্ব সম্পর্কে ইসলাম মূল্যবান নির্দেশনা দিয়েছে। পানি শব্দের আরবি ‘মাআ’। পবিত্র কোরআন প্রায় ৬০ বার পানি প্রসঙ্গ আনা হয়েছে।

পানি থেকে প্রাণ খোদার দান। পবিত্র কোরআনের সুরা নুরের ৪৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ সব জীবকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন।’

সুরা আম্বিয়ার ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি সব প্রাণবান জিনিসকে পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। তবু কি তারা ঈমান আনবে না?’

সুরা ওয়াকিয়ার ৬৮ থেকে ৭০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা যে পানি পান করো সে সম্পর্কে ভেবে দেখেছ কি? বৃষ্টিভরা মেঘ থেকে তোমরা কি তা বর্ষণ করো, নাকি আমি বৃষ্টি বর্ষণকারী? ইচ্ছা করলে আমি তা লবণাক্ত করে দিতে পারি, তবু তোমরা কৃতজ্ঞ হও না?’

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বৃষ্টি, নদী, ঝরনা ও সাগরকে পানির মূল উৎস বলে বর্ণনা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি আসমান থেকে বরকতময় পানি (বৃষ্টি) নাজিল করেছি। অতঃপর তা দ্বারা আমি উৎপন্ন করি বাগ-বাগিচা ও কর্তনযোগ্য শস্যদানা।’ (সুরা : ক্বাফ, আয়াত : ৯)

কাউকে পানি পান করানো উত্তম দান। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা) বলেন, ‘কাউকে দান করার উত্তম পন্থা হলো তাকে পানি দান করা।’ তিরমিজি শরিফের একটি হাদিসে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমার বন্ধুকে হাসিমুখে বরণ করা সদকা, কাউকে তার প্রাণীর ওপর মালামাল তুলে দেওয়া সদকা এবং প্রতিবেশীর পাত্রে পানি তুলে দেওয়াও সদকা।’

পানির যথেচ্ছ ব্যবহার ইসলাম অনুমোদন করে না। আল্লাহর রাসুল (সা.) একবার সাদ (রা.)-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি তখন অজু করছিলেন। মহানবী (সা.) জিজ্ঞেস করেন, এই অপচয়ের হেতু কী? সাদ (রা.) বলেন, অজুর মধ্যে অপচয় আছে? মহানবী (সা.) বলেন, ‘হ্যাঁ, তুমি যদি একটি প্রবহমান নদীর তীরেও থাকো (তবু সেখানে পানির যথেচ্ছ ব্যবহার করা যাবে না)।’ (ইবনে মাজাহ)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ইসলাম পানির ব্যবহারের ওপর খুব বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। যদি সেই পানি একটি বড় নদীরও হয়, তা সত্ত্বেও সেই পানি ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে।

ইসলাম পানির অপচয়কে হালকাভাবে দেখে না। সুরা আরাফের ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এবং খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় কোরো না।’

এখানে পানির অপচয় করতে নিষেধ করা হয়েছে।

পানির সঠিক ব্যবহারের পাশাপাশি পানির দূষণ রোধে ইসলাম বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে। এক হাদিসে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘মানুষের কষ্ট হয়, এমন তিনটি কাজ পরিহার করো। পানির উৎস, চলাচলের রাস্তা ও গাছের ছায়ায় মলত্যাগ কোরো না।’ (ইবনে মাজাহ)

এখানে দেখা যায়, আল্লাহর রাসুল (সা.) পানির দূষণ না করার নির্দেশ দিয়েছেন। তা ছাড়া পানি সঠিকভাবে ব্যবহার এবং এর শুদ্ধতা ঠিক রাখার জন্য পানির পাত্র ঢেকে রাখা এবং বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের জন্য পানি আলাদা আলাদা পাত্রে রাখারও নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম।

পানির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং পানি নিরাপত্তা নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া খুব জরুরি। বিভিন্ন দেশের চিন্তাবিদ ও দায়িত্বশীলরা পানির ব্যবহার এবং পানির রিসাইক্লিং পদ্ধতির বিষয়ে এখন গলদঘর্ম।

প্রথমত, উন্নয়নশীল দেশগুলো পানির সুষ্ঠু ব্যবহারের জন্য উন্নত ডিভাইস এবং পানি রিসাইক্লিং ইনস্ট্রুমেন্ট কাজে লাগাতে পারে। দ্বিতীয়ত, ছাদে পানি ধরে রাখার পাত্র ব্যবহার করে বৃষ্টির পানি সহজে ও সুলভে পেতে পারে। পানি সংরক্ষণে উদ্ভিদ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। গাছ বৃষ্টির পানি শোষণ করে, মাটির ক্ষয়রোধ করে এবং মাটিকে উর্বর করে।

বর্তমানে বন ও বৃক্ষ হারিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে আমরা এ সমস্যার সমাধান করতে পারি এবং পরিবেশগত ভারসাম্য ঠিক রাখতে পারি। ইসলাম বৃক্ষরোপণে উৎসাহী করে এবং এটাকে সদকা হিসেবে গণ্য করে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোনো মুসলিম যদি গাছ রোপণ করে অথবা বীজ বপন করে, তারপর পাখি অথবা মানুষ এর থেকে খাবার খায়, তাহলে এই কাজ তার জন্য একটি দান হিসেবে গণ্য করা হয়।’ (সহিহ বুখারি)

মুসলিম হিসেবে প্রতিটি সৃষ্টিকে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। পানি সংরক্ষণ ও এর বিশুদ্ধতা রক্ষা করাও আমাদের অন্যতম কর্তব্য।

লেখক : প্রাবন্ধিক, শিশু সাহিত্যিক ও সাবেক ডিএমডি, ইসলামী ব্যাংক।

আরও সংবাদ

Back to top button