ধর্ম

শরণার্থীর প্রতি মানবিক হওয়ার আহ্বান

এখনই সময় :

২০ জুন বিশ্ব শরণার্থী দিবস। ১৯৫১ সালে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংগঠন The UN Refugee Agency অন্তর্জাতিক শরণার্থী কনভেনশনে শরণার্থীদের অধিকার সংবলিত ‘আন্তর্জাতিক শরণার্থী সনদ’ স্বাক্ষরিত হয়। করোনা বৈশ্বিক মহামারির এ বছর শরণার্থীদের সহযোগিতায় সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে Every Action Counts তথা সব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।

(http://bitly.ws/8LhT)

শরণার্থীর পরিসংখ্যান : দি ইউএন রিফিউজি এজেন্সির ২০১৮ সালের পরিসংখ্যান মতে, বিশ্বব্যাপী ৭০.৮ মিলিয়ন মানুষ ধর্ম, বর্ণ, রাজনীতি ও অর্থনৈতিকভাবে নির্যাতন, সংঘাত ও সহিংসতার শিকার হয়ে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত (Forcibly Displaced) হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ২৫.৯ মিলিয়ন শরণার্থী (Refugee) বসবাস করছে। এ ছাড়া ৩.৫ মিলিয়ন মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে (Asylum Seekers) আছে। শরণার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশ পাঁচ দেশের অধিবাসী : সিরিয়া, আফগানিস্তান, দক্ষিণ সুদান, মিয়ানমার ও সোমালিয়া—যাদের প্রায় সবাই মুসলিম।

(http://bitly.ws/8LhZ)

ইসলামে শরণার্থী ভাবনা

আদিকাল থেকে নিপীড়ন থকে বাঁচতে অনেকে মাতৃভূমি ত্যাগ করেছেন। পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন যুগে নিজ ভূমি ত্যাগ করা নবী-রাসুল ও অন্যান্য ব্যক্তির ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ ইবরাহিম (আ.)-এর নিজ ভূমি ইরাকের বাবেল ছেড়ে শাম গমনের বর্ণনা দেন, ‘আর লুত তাঁর প্রতি ঈমান আনে। অতঃপর ইবরাহিম বলল, আমি আমার প্রতিপালকের উদ্দেশে দেশ ত্যাগ করছি।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ২৬)। মুসা (আ.) তত্কালীন রাজা ফেরাউনের অবিচার থেকে বাঁচতে মাদায়েনের উদ্দেশে মিসর ত্যাগ করেন। কোরআনে এসেছে, ‘অতঃপর তিনি (মুসা) ভীত ও সতর্ক হয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়েন। আর বলেন, হে আমার প্রতিপালক, তুমি জালিম সম্প্রদায় থেকে আমাকে রক্ষা করো। মাদায়েনের দিকে যাত্রা করে তিনি বললেন, আশা করি আমার প্রতিপালক আমাকে সরল পথ প্রদর্শন করবেন।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ২০)

মক্কার অবিশ্বাসীদের নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে বাঁচতে প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর সাহাবিরা মক্কা ছেড়ে মদিনায় আশ্রয় নেন। মহানবী (সা.)-এর হিজরত সম্পর্কে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা তাঁকে সাহায্য না করলে (জেনে রাখো) আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করেছেন, যখন কাফেররা তাঁকে বের করে দিয়েছিল, গুহায় থাকাকালে দুজনের দ্বিতীয় জন সঙ্গীকে বলল, তুমি চিন্তা কোরো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৪০)

নিরাপদ আশ্রয় খোঁজা মুমিনের কর্তব্য : কেউ প্রাণনাশের আশঙ্কা করলে কিংবা দ্বিন পালনে অপারগ হলে মুসলিম দেশে হিজরত করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের তাদের ঘর-বাড়ি থেকে অন্যায়ভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে, শুধু এ কারণে যে তারা বলে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ…।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৪০)

নিরাপদ আশ্রয়ে গমন মানুষের অধিকার : ইসলাম আশ্রয়প্রার্থীদের নিরাপদ স্থানের ব্যবস্থার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে, জিহাদ করেছে, আর যারা আশ্রয় দিয়েছে ও সাহায্য করেছে, তারাই প্রকৃত মুমিন, তাদের জন্য ক্ষমা ও সম্মানজনক রিজিক আছে।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ৭৪)

১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ঘোষিত সর্বজনীন মানবাধিকারের (Universal Human Rights) ১৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, নিপীড়ন থেকে বাঁচতে অন্য দেশের আশ্রয় গ্রহণের অধিকার সবার আছে।

(http://bitly.ws/8MKp) নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ পুণ্যের কাজ : দ্বিন পালনে বাধাপ্রাপ্ত হলে নিরাপদ স্থানে হিজরত করা জরুরি। দ্বিন পালনে অপারগ হয়েও হিজরত না করা নিন্দনীয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা নিজেদের ওপর জুলুম করে তাদের প্রাণ গ্রহণের সময় ফেরেশতারা বলে, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে? তারা বলে, দুনিয়ায় আমরা অসহায় ছিলাম, তাঁরা বলে, আল্লাহর জমিন কি এতটুকু প্রশস্ত ছিল না, যেখানে তোমরা হিজরত করবে? তাদের আবাসস্থল জাহান্নাম, তা কত মন্দ আবাস!’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৯৭)

অমুসলিমও আশ্রয় পাবে : কোনো অমুসলিম ইসলামী রাষ্ট্রে নিরাপত্তা চাইলে তাকে আশ্রয় দেওয়া জরুরি—উদ্দেশ্য হবে ইসলামের সৌন্দর্য ও সৌহার্দ্য প্রদর্শন এবং তাকে দ্বিনের দাওয়াত দেওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আপনার কাছে কোনো মুশরিক আশ্রয় প্রার্থনা করলে আপনি তাকে আশ্রয় দিন, যাতে সে আল্লাহর কালাম তথা কোরআন শুনতে পায়, অতঃপর তাকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিন, তারা কোনো কিছু জানে না।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৯)

শরণার্থী ও সহায়তাকারী পরস্পর বন্ধু : শরণার্থীর সব মৌলিক অধিকার ইসলামী বিধান অনুযায়ী নিশ্চিত করা ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধানের কর্তব্য। তাই শরণার্থীর বাসস্থান, খাদ্য, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও সুশিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। আল্লাহ বলেন, ‘যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে, জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে, আর যারা আশ্রয় দিয়েছে ও সাহায্য করেছে তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু, আর যারা ঈমান এনেছে তবে হিজরত করেনি, হিজরত না করা পর্যন্ত তাদের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব তোমাদের নেই।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ৭২)

আশ্রয়প্রার্থীর অর্থবিত্তে লোভ করা দোষণীয় : আশ্রয়প্রার্থীর নিজস্ব সম্পদ ও প্রাচুর্য দেখে লোভ করা গর্হিত কাজ; বরং সাধ্যমতো সংকটাপন্ন আশ্রয়প্রার্থীর পাশে দাঁড়ানো সবার জন্য কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা মুহাজিরদের আগমনের আগে (মদিনায়) বসবাস করত ও ঈমান এনেছিল, তাঁরা মুহাজিরদের ভালোবাসে ও মুহাজিরদের প্রদত্ত বিষয়ে অন্তরে ঈর্ষা পোষণ করে না, নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও অন্যকে প্রাধান্য দেয়, যারা অন্তরের কার্পণ্য থেকে মুক্ত তারাই সফলকাম।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ৯)

শরণার্থীর সহায়তা করা সবার কর্তব্য : মানুষ হিসেবে শরণার্থীদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং তাদের সহায়তা করা মুসলমানের দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আহারের প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও তাঁরা অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে আহার করায়।’ (সুরা : ইনসান, আয়াত : ৯)

hedaetullah2015@gmail.com

 

আরও সংবাদ

Back to top button