সারাদেশ

পলিথিনের ঝুপড়িতে থাকেন শতবর্ষী আমজেদ

এখনই সময় :

শতবর্ষী বৃদ্ধ আমজেদ হোসেন। বাড়ি বামনা উপজেলার রামনা ইউনিয়নের ঘোপখালী গ্রামে। বয়সের ভারে চলার ক্ষমতাও হারিয়েছেন তিনি। এক সন্তান, পুত্রবধূ ও চার নাতি নিয়ে একটি পলিথিনের ঝুপড়ি ঘরে তাঁর বসবাস। পলিথিনের ছিদ্র দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে বিছানায়। দিনের আলোয় কোনোমতে মাথাটাকে বৃষ্টি থেকে রক্ষা করতে পারলেও রাতের বৃষ্টি প্রতিদিনই ঘুম কেড়ে নেয় এই শতবর্ষী বৃদ্ধ আমজেদের। কর্মক্ষম ওই মানুষটি ও তাঁর সন্তান একটি ঘরের জন্য চেয়ারম্যান, মেম্বার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ঘুরেও কোনো সুফল পায়নি। চলতি বর্ষায় কাদা-পানির আলিঙ্গনে রাত শেষে ভোর আসে তাঁর পরিবারের সকলের।

আশ্রয়ন প্রকল্প ২ এর আওতায় বর্তমান সরকার জমি আছে ঘর নেই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে আসছে। কিন্তু আমজেদের মতো প্রকৃত উপকারভোগীরা চিরদিন বর্ষা আর ঝড়ে আতঙ্কে দিন কাটায় বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

আজ মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকালে ঘোপখালী গ্রামে শতবর্ষী আমজেদের বাড়ি গিয়ে দেখা গেছে, গোয়ালঘরের চেয়েও স্যাঁতস্যাঁতে একটি ঘরে গৃহপালিত পশুদের সাথে বসবাস করছেন আমজেদ ও তাঁর ৭ সদস্যের পরিবারটি। অবশ্য ওই ঘরটি তার নিজের নয়, ছোট ছেলে ইদ্রিস হোসেনের। ইদ্রিস পেশায় সুইপার এর কাজ করে। বিভিন্ন জনের টয়লেট পরিষ্কার করে কাটে তাঁর জীবন। তবুও বৃদ্ধ পিতা, চার জন সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে ওই ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করেন তারা। সুইপারের কাজ করে যে রোজগার হয় তা পিতার ওষুধ ও পরিবারের ভরণপোষণেই শেষ হয়ে যায়। ঘর তোলার একটি কড়িও অবশিষ্ট থাকে না। তাই বাঁশের খুঁটির তৈরি ওই ঝুপরি ঘরে পলিথিন এর ছাউনি দিয়ে কোনোমতে মাথাটাকে রক্ষা করছে তার পরিবার। পিতার শোবার জায়গার ঠিক ওপর দিয়ে বৃষ্টিতে গড়িয়ে পানি পড়ে বিছানা ভিজে যায়। নিজেদের থাকার জায়গাটা আরো খারাপ। ঘরের চার পাশে বেড়া বলতে মরিচা ধরা ফুটো ও ভাঙা ঢেউটিন। ঘরের কোনো কোনো স্থানে সেটুকুও নেই। প্রতিদিন ঝড়-বৃষ্টি আর নানান দুর্ভোগে কাটে ওই পরিবারের দিন।

আমজেদের দুই ছেলেভ বড় ছেলে ভ্যান চালিয়ে সংসার চালায় আর ছোট ছেলে সুইপারের কাজ করে। বড় ছেলে মোটামুটি স্বচ্ছল থাকলেও ছোট ছেলে ইদ্রিসের অর্থনৈতিক অবস্থা একেবারে খারাপ। তবুও ছোট ছেলের কাছে তিনি বৃদ্ধ বয়সে আশ্রয় নিয়েছেন। দুই বেলা ভাত জুটলেও জোটেনা স্বাস্থ্য ও অন্যান্য অধিকার। ছেলে ইদ্রিস ফরাজী সুইপারের কাজ করে চারজন ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া করাচ্ছে। তবে কতদিন এভাবে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারবে সে সংশয় দেখা দিয়েছে পরিবারে। একসময় পেটের তাগিদে ওই সন্তানদেরও হয়তো কাজে নেমে যেতে হবে বাবার সাথে।

চলতি করোনা পরিস্থিতিতে খেটে খাওয়া মানুষ যখন কর্মহীন হয়ে পড়ে তখন সবচেয়ে করুণ অবস্থায় দিন কাটাতে হয় ইদ্রিসের মতো এমন খেটে খাওয়া পরিবারগুলোর। সরকারি সহায়তাও ভাগ্যে জোটে না তাদের। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের স্বজনপ্রীতি সে প্রাপ্যটুকুও কেড়ে নেয় তাদের কাছ থেকে।

শতবর্ষী বৃদ্ধ আমজেদ হোসেন বলেন, মুই কত বার যে চেয়ারম্যান মেম্বারের কাছে গেছি হ্যার হিসাব নাই। হ্যার পরও মোর একখান ঘর জোটে না। আপনেরা আইছেন দ্যাহেন মোম্মে মুই মোর পোলার লগে থাহি। রাইতে পানি পরে বিছনায়। ঘুমাইতে পারিনা এক রাইতও। শেষ বয়সে একটু শক্ত মাথা গোঁজার ঠাঁইচাই মুই।

আমজেদ হোসেনের ছেলে মো. ইদ্রিস ফরাজী বলেন, ভাই আপনারা আইছেন হ্যাতেই মুই খুশি। আইজ পর্যন্ত মোর এই দুর্দশার চিত্র কেউ দেখতে আয়নায়। চেয়ারম্যান, মেম্বাদের কাছে কতবার গেছি হ্যারা কোন গুরুত্বই দেয়না মোরে। মুই লেট্রিন পরিস্কার করে সংসার চালাই বলে সমাজে কেউ গুরুত্ব দেয় না। মোরে একখান ঘরের ব্যবস্থা কইরা দিলে বৃদ্ধ পিতা ও আমার পরিবারকে নিয়া একটু সাচ্ছন্দে দিন কাটাতে পারতাম।

৩ নম্বর রামনা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আ. খালেক জমাদ্দার বলেন, আমজেদ হোসেনের বসবাসের ঘরের অবস্থা খুবই খারাপ। আমরা পরিষদ থেকে তার নাম আশ্রয়ন প্রকল্প ২ এ তালিকা করে পাঠিয়েছি। হয়তো এবারের বরাদ্দে তার ঘরের ব্যবস্থা হতে পারে।

বামনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিনা সুলতানা বলেন, ওই বৃদ্ধের থাকার জায়গা নেই সেটা আমি জেনেছি। আমি নিজে ওই বাড়িতে যাব। যদি সে ঘর পাওয়ার যোগ্য হয় তাহলে তার জন্য ঘরের ব্যবস্থা করে দেব।

আরও সংবাদ

Back to top button