ধর্ম

নারীর প্রতি সহিংসতা নয়

এখনই সময় :

করোনাভাইরাসে সৃষ্ট বৈশ্বিক মহামারিতে অবরুদ্ধ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বিশ্বের অনেক দেশেই। অবরুদ্ধ পরিবেশে পারিবারিক কলহ ও নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে পারিবারিক কলহ ও নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধির নানা তথ্য ও পরিসংখ্যান প্রকাশ পেয়েছে। গত ১ মে বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশে গত তিন মাসের লকডাউনে পারিবারিক সহিংসতা ২০ শতাংশ বেড়েছে। একই প্রতিবেদনে লকডাউনে বাংলাদেশেও পারিবারিক কলহ ও নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধির তথ্য দেওয়া হয়েছে।

ইসলামে পরিবার ও পারিবারিক জীবন

ইসলামী জীবনব্যবস্থায় পরিবার হলো মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, পরিবারিক প্রশান্তির জায়গা। আর দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তার নিদর্শন হলো, তিনি তোমাদের থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য সঙ্গিনী, যেন তোমরা প্রশান্তি লাভ করো। তিনি তোমাদের মধ্যে দান করেছেন ভালোবাসা ও সহমর্মিতা। নিশ্চয়ই এতে রয়েছে চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন।’ (সুরা : রুম, আয়াত : ২১)

কোরআনের ব্যাখ্যাকাররা বলেন, প্রশান্তি লাভের শর্ত হলো পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহমর্মিতা।

কলহ-সহিংসতা বৃদ্ধির কারণ ও প্রতিকার

লকডাউনে পারিবারিক কলহ ও নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধির বেশ কিছু কারণ সমাজ বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মীরা তুলে ধরেছেন। যে কারণগুলো ইসলামী শরিয়ত ও জীবনব্যবস্থার আলোকে সমাধান করা সম্ভব; বরং বলা যায়, এর প্রতিটি কারণই ইসলামের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য এবং তা পরিহার করা আবশ্যক।

ক. মানসিক অস্থিরতা : লকডাউনের কারণে দৈনন্দিন জীবনে যে পরিবর্তন এসেছে তা তাদের ভেতর মানসিক অস্থিরতা তৈরি করেছে। কোরআনে প্রশান্ত আত্মার প্রশংসা করে বলা হয়েছে, ‘হে প্রশান্ত আত্মা! ফিরে চলো তোমার প্রতিপালকের পানে, সন্তুষ্টচিত্তে ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর প্রবেশ করো আমার বান্দাদের মধ্যে এবং প্রবেশ করো আমার জান্নাতে।’ (সুরা : ফজর, আয়াত : ২৭-৩০)

খ. উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা : দীর্ঘ লকডাউনে বেশির ভাগ মানুষ তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন, যা তাদের মানসিক ও আচরণগত ভারসাম্য নষ্ট করছে। ফলে সামান্য বিষয় নিয়ে সাংসারিক কলহে লিপ্ত হচ্ছে। ইসলাম আল্লাহ ও ভাগ্যে বিশ্বাসের মাধ্যমে উদ্বেগ থেকে মুক্তি দিয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর নির্ভর করে তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। আল্লাহ তার ইচ্ছা পূরণ করবেনই; আল্লাহ সব কিছুর জন্য স্থির করেছেন নির্দিষ্ট মাত্রা।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ৩)

গ. সাংসারিক কাজে ভুল : লকডাউনে পরিবারের প্রায় সব সদস্য ঘরে বেশি সময় কাটানোর কারণে সাংসারিক কাজের চাপ বেড়েছে। কাজের চাপে নারী মেজাজ হারাচ্ছে আর পুরুষ তার ওপর চড়াও হচ্ছে। সাংসারিক কাজ শুধু নারীর—ইসলাম এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করে এবং সাংসারিক কাজে সবার অংশগ্রহণ ও এর ভুলত্রুটি উপেক্ষা করার শিক্ষা দেয়। আনাস বিন মালিক (রা.) দীর্ঘ ১০ বছর ঘরে-বাইরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেবা করেছেন। তাঁর বক্তব্য হলো, ‘আমার কোনো কাজে আপত্তি করে তিনি কখনো বলেননি, এমন কেন করলে বা এমন কেন করলে না।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৩০৯)

ঘ. যৌতুক : গণমাধ্যমে প্রকাশ, লকডাউনে আর্থিক সংকটে পড়ে বহু পুরুষ নারীর ওপর অত্যাচার করছে যৌতুকের দাবিতে। সম্প্রতি যৌতুকের দায়ে ননদ ও শাশুড়ির নির্যাতনে প্রাণ হারিয়েছে এক নারী। ইসলামে যৌতুক ঘৃণ্য কাজ। কেননা তা অন্যের সম্পদ আত্মসাতের নামান্তর। রাসুলে আকরাম (সা.) বলেছেন, ‘যে উপহার খুশি মনে দেওয়া হয় সেটাই শুধু বৈধ।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২০৭১৪)

পারিবারিক কলহ দূর করতে করণীয়

পারিবারিক জীবনে শান্তি ও স্বস্তি লাভে ইসলাম কয়েকটি বিষয় লক্ষ রাখতে বলে। তা হলো—

১. পারস্পরিক সহানুভূতি : ইসলাম পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে বলেছে। কোরআনে সাহাবিদের প্রশংসায় বলা হয়েছে, ‘যারা পরস্পরের প্রতি দয়াশীল।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘দয়াশীলদের প্রতি আল্লাহ দয়া করেন। তোমরা জমিনের অধিবাসীদের প্রতি দয়া করো, আসমানের যিনি আছেন তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪৯৪১)

২. উপেক্ষা ও ক্ষমা : ইসলাম আপনজনের ভুলত্রুটি উপেক্ষা ও ক্ষমা করতে বলে। আল্লাহ বলেন, ‘তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের ভুলত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন?’ (সুরা : নুর, আয়াত : ২২)

৩. কৃতজ্ঞতা আদায় করা : নারী ও পুরুষ উভয়ের উচিত তার জীবনসঙ্গীর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা এবং আচার-আচরণের মাধ্যমে তা প্রকাশ করা। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের কৃতজ্ঞতা আদায় করে না, সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা আদায় করে না।’ (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৪৮১১)

৪. প্রত্যাশা কমানো : ইসলাম সংসারে নারীর পরিশ্রম ও পুরুষের অর্থ ব্যয় উভয়টিকে ‘সদকা’ বা দান হিসেবে গণ্য করে—যার প্রতিদান একজন মুমিন শুধু আল্লাহর কাছেই প্রত্যাশা করে। তাই সাংসারিক জীবনে পরস্পরের প্রতি প্রত্যাশা কমাতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মানুষের সর্বোত্তম মুদ্রা সেটি, যা সে তার পরিবারের খরচে ব্যয় করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৯৯৪)

৫. পরিবারে দ্বিন চর্চা : পারিবারিক শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য দ্বিনের চর্চা থাকা আবশ্যক। আল্লাহ বলেন, ‘যারা তাদের ঘরের ভিত্তি রেখেছে তাকওয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টির ওপর; তারা উত্তম, নাকি তারা যারা তাদের ঘরের ভিত্তি রেখেছে একটি ধ্বংসোন্মুখ খাদের কিনারে? যা তাকেসহ জাহান্নামের আগুনে পতিত হবে। আল্লাহ অবিচারকারীদের সত্য পথ দেখান না।’ (সুরা : তওবা, আয়াত : ১০৯)

আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।

[email protected]

Related Articles

Back to top button
Close