জাতীয়

মানচিত্র অঙ্কনে মুসলমানদের অবদান

এখনই সময় :

মানচিত্র তৈরির কলাকৌশল ও বিজ্ঞানকে বলা হয় মানচিত্রাঙ্কনবিদ্যা। সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে এর শুরু। তখন মানুষ চামড়া, হাড়, পাথর ইত্যাদির ওপর সহজ সরল চিত্র ও রেখা আঁকত। তখন তো আধুনিককালের মতো কাগজ ও অন্য উপাদান ছিল না। মানচিত্র অঙ্কন বিজ্ঞানের ইতিহাসের চরম বিকাশ সাধিত হয় অষ্টম থেকে সতেরো শ শতকের মধ্যে। আর এ সময় সারা দুনিয়ায় শত শত মুসলিম মানচিত্র অঙ্কনবিদ জন্মগ্রহণ করেন এবং তাঁদের হাত ধরে মূলত আধুনিক মানচিত্র অঙ্কনবিদ্যার পথচলা শুরু হয়।

মুসলিম মানচিত্র অঙ্কন বিদ্যার ইতিহাস

প্রাক-ইসলামিক যুগে মানচিত্র অঙ্কন বিদ্যা আরবে কল্পনা বা দর্শনগত অবস্থায় বিরাজমান ছিল। তবে সাত শতকের দিকে ইসলামের আগমন এবং পরবর্তী সময়ে আরব উপদ্বীপে এর বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানচিত্র অঙ্কন বিদ্যারও অগ্রগতি শুরু হয়। আট শতকে কাগজ আবিষ্কারের ফলে মানচিত্র অঙ্কন বিদ্যার ক্ষেত্রেও আসে বিরাট পরিবর্তন। এ সময় মুসলিম মানচিত্র অঙ্কনবিদরা গ্রিক, ব্যবিলনীয় ও ভারতীয় সংস্কৃতির ভিত্তিতে কল্পিত এবং পাঠসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা, মানচিত্রের ধারণার চিত্র, অঙ্কন ইত্যাদি কাগজের পাতায় পাতায় স্থানান্তর করেন। এর পর থেকে শুরু হয় মানচিত্রাঙ্কনবিদ্যার সফল যাত্রা। নবম শতকের মধ্যে মুসলিম ব্যবসায়ী, নাবিক ও উদ্ভাবকরা ভারত, শ্রীলঙ্কা, মালয় ও পূর্ব জাভা থেকে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের মাদাগাসকারের পশ্চিম হয়ে চীন, জাপান ও কোরিয়ায় ছড়িয়ে পড়েন। ফলে এই এলাকা সম্পর্কে তাঁদের সরাসরি অভিজ্ঞতা ও বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে আফ্রিকা উপকূল, ভারত মহাসাগর এবং দূর প্রাচ্য নিয়ে মুসলিম মানচিত্র অঙ্কনবিদরা তাঁদের মানচিত্র অঙ্কন বিদ্যার আরো বিকাশ ও উন্নয়ন ঘটান। দশম শতকে এসে মানচিত্রাঙ্কনবিদ্যা একটি নতুন আঙ্গিক লাভ করে। তখন থেকে সামনের দিনগুলোতে মুসলিম মানচিত্রাঙ্কনবিদরা তাঁদের তৈরি মানচিত্র বিভিন্ন ভ্রমণ গাইড, নৌ মানচিত্র এবং অন্য ঐতিহাসিক স্থাপনায় সন্নিবেশ করেন। ফলে ইসলামিক দুনিয়ার সর্বত্র বিশেষ করে উত্তর আফ্রিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও ভারতে এই মানচিত্র ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়।

তেরো শতকের পর থেকে মুসলিম মানচিত্রাঙ্কনবিদদের এসব মানচিত্র কপি হয়ে মুসলিম বিশ্বের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। আর এই জনপ্রিয় মানচিত্র অঙ্কন বিদ্যা একটি ইসলামিক মানচিত্র অঙ্কন বিদ্যার অ্যাটলাস তৈরিতে সাহায্য করে, যেখানে বিভিন্ন মানচিত্র অঙ্কনবিদের বেশ কয়েকটি মানচিত্র স্থান পায়। ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন লাইব্রেরিতে এসব মানচিত্র স্থান পায় এবং ওই সব লাইব্রেরির মাধ্যমে অষ্টম থেকে চৌদ্দ শতকের মধ্যে এই মানচিত্রগুলো সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।

মানচিত্র অঙ্কন বিদ্যার পরবর্তী উন্নয়ন সাধিত হয় তুর্কিদের আমলে, অর্থাৎ অটোমান খলিফাদের শাসনামলে। তখন থেকে মুসলিম মানচিত্র অঙ্কন বিদ্যার প্রতি ইউরোপের জোকপ্রবণতা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। ফলে চৌদ্দ থেকে ষোলো শতকের মধ্যে মুসলমানদের এই অর্জন তারা করায়ত্ত করে। মুসলমানদের অত্যন্ত সঠিক ও নির্ভুল মানচিত্রগুলো কাজে লাগিয়ে পরবর্তীকালে বাকি বিশ্বের জন্য তৈরি করে। এভাবে মুসলিম মানচিত্রাঙ্কনবিদ্যার উন্নয়ন ও বিকাশ সাধিত হয়।

ইসলামিক মানচিত্র অঙ্কন বিদ্যার অর্জন

প্রাথমিকভাবে মুসলিম মানচিত্র অঙ্কনবিদরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যে সফলতা অর্জন করেন, তার মধ্যে রয়েছে ভৌগোলিক গবেষণামূলক আলোচনাগ্রন্থ রচনা, পৃথিবী সম্পর্কিত মানচিত্র, সাগরবিষয়ক মানচিত্র এবং পোরটোলান মানচিত্র।

গবেষণামূলক আলোচনাগ্রন্থ

ইসলামের প্রাথমিক সময়ে ডায়েরি, ভ্রমণ নির্দেশিকা প্রচুর পরিমাণে লেখা হয়, যার সঙ্গে ইসলামী দুনিয়া এবং বিশ্বের অন্য সমাজের সাধারণ ভৌগোলিক বর্ণনা সন্নিবেশিত হয়েছিল। তখন মুসলিম মানচিত্রবিদরা অনেক গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা করেন। এর কয়েকটি নিচে তুলে ধরা হলো।

১. ‘সুরাত আল-আরত (পৃথিবীর চিত্রের বই)’ : পারস্যের খ্যাতনামা পণ্ডিত আল-খাওয়ারাজমি নবম শতকে তা রচনা করেন। এই পুস্তকে ৫৪৫ শহরের অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের তালিকা প্রকাশিত হয়। এতে সাগর, নদী, পর্বতমালা, দ্বীপ ও বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলের বর্ণনা সন্নিবেশিত হয়েছে। এই গ্রন্থে আরব মানচিত্রাঙ্কনবিদ্যার আলোকে চারটি আঞ্চলিক মানচিত্রও যুক্ত হয়।

২. ‘আল মাসালিক-ওয়াল-মামালিক (সড়ক ও রাজত্বের বই)’ : মুসলিম বিশ্বের প্রশাসনিক এবং ক্রমবর্ধমান পোস্টাল সার্ভিসকে সামনে রেখে এই পুস্তকটি লেখা হয়। পরে এটিতে ভৌগোলিক বিষয়গুলো যুক্ত করে মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক আলোচনাসহ অমুসলিম বিশ্ব তথা ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিবরণ প্রকাশ করা হয়। দশম শতকে বিখ্যাত ভূগোলবিদ এবং বাগদাদের সরকারি পোস্টাল সার্ভিসের পরিচালক ইবনে খুরাদাদবিহ এই গ্রন্থ রচনা করেন। এতে তিনি আরববিশ্ব, চীন, কোরিয়া ও জাপানের বাণিজ্য পথ নির্দেশ করেন। পরবর্তীকালে অন্য মুসলিম পণ্ডিতরা তাঁদের ভৌগোলিক কর্মে একই নাম ব্যবহার করেন এবং আল-বাকরি ও আল-ইসতাখারি নাম দুটি যুক্ত করেন।

৩. দশম শতকের জনপ্রিয় ভৌগোলিক আলোচনাগ্রন্থ ছিল আল-মুকাদ্দিসির ‘আহসান আল-তাকাসিম ফি মারিফাত আল-আকালিম (আঞ্চলিক জ্ঞানের সেরা বিভাগ)’, যার মাধ্যমে মুসলিম ভূগোলবিদ্যার পদ্ধতিগত ভিত্তিমূল রচিত হয়। এই বইয়ে আল-মুকাদ্দিসি ভৌগোলিক পরিভাষা, পৃথিবীর বিভিন্ন বিভাগপদ্ধতি এবং প্রায়োগিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।

৪. এগারো শতকে রচিত হয় ‘গারেইবাল ফানুন ওয়া মুলাহ-আল-ইউউন (চোখের বিজ্ঞান ও মার্বেলবিষয়ক দুর্লভ বই)’ গ্রন্থ। বইটিতে ইসলামী ভৌগোলিক ধারণা এবং মহাজাগতিক বিষয়সহ মানচিত্র তৈরি সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি তুলে ধরা হয়।

৫. বারো শতকে আল-ইদরিসি ‘নুজহাত আল-মুশতাকফিকাতিরাক আল-আফাক’ নামীয় গ্রন্থটি রচনা করেন। মুসলিম ভৌগোলিক এবং মানচিত্র অঙ্কনবিদদের ওপর একটি অনবদ্য আলোচনাগ্রন্থ। এই গ্রন্থ রচনায় সিসিলির রাজা নরম্যানের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। এই বইটি মূলত একটি অ্যাটলাস (ভূচিত্রাবলি), যাতে পৃথিবীকে একটি ভূ-গোলক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে গোলার্ধ, জলবায়ু ও সাগরের বর্ণনাও রয়েছে। বইটিতে একটি গোলাকার বিশ্বমানচিত্র এবং ৭০টি আংশিক মানচিত্র সংযুক্ত রয়েছে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, শিশুসাহিত্যিক ও সাবেক ডিএমডি, ইসলামী ব্যাংক

Related Articles

Back to top button
Close