ধর্ম

ইসলামে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তা

এখনই সময় :

ইসলাম প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যার ভিত্তি পারস্পরিক সহযোগিতা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘একজন মুমিন আরেকজন মুমিনের জন্য ইমারতস্বরূপ, যার একাংশ অপরাংশকে শক্তিশালী করে থাকে। এই বলে তিনি তাঁর হাতের আঙুলগুলো একটার মধ্যে আরেকটা প্রবেশ করালেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৮১)

করোনাকালে কেমন আছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী

১২ মে ২০২০ কালের কণ্ঠে ‘লকডাউনে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে ৫৪ শতাংশ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লকডাউনের ফলে খাদ্যসংকটে পড়েছে ৫৭ শতাংশ পরিবার। প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের ব্যবস্থা না থাকায় মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়েছে ৬৩ শতাংশ। লকডাউনে সৃষ্ট সংকট মোকাবেলায় সঞ্চয় ভেঙে ফেলেছে ৪৮ শতাংশ পরিবার। গরু-ছাগল বিক্রি করে ফেলেছে ৩৫ শতাংশ পরিবার।

প্রতিবেদনে বেসরকারি সংস্থা কোস্ট ট্রাস্টের সূত্রে কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায় মহাজনী ঋণ শোধ করতে না পারায় একজন দরিদ্র মানুষকে হত্যা করা হয় বলে জানানো হয়েছে।

আল কোরআনে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী

সমকালীন পরিভাষা ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠী’র অনুরূপ কোনো শব্দ বা পরিভাষা পবিত্র কোরআনে পাওয়া যায় না। তবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য বোঝায় এমন একাধিক শব্দ কোরআনে পাওয়া যায়। যেমন আল্লাহ বলেছেন, ‘জাকাত কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত ও তত্সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য, যাদের চিত্তাকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণে ভারাক্রান্তদের, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের জন্য। এটা আল্লাহর বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৬০)

এই আয়াতে ব্যবহৃত ফকির, মিসকিন, গারিম শব্দত্রয় দ্বারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও নিম্ন আয়ের নিঃস্ব মানুষকে চিহ্নিত করা সম্ভব। এ ছাড়া কোরআনে ‘সায়িল’ (ভিক্ষুক), ‘এতিম’ (বাবাহারা সন্তান), ‘মিসকিনান জা-মাতরাবা’ (দারিদ্র্য নিষ্পেষিত নিঃস্ব) ইত্যাদি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং তুমি এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না এবং প্রার্থীকে ভর্ত্সনা করো না।’ (সুরা দুহা, আয়াত : ৯-১০)

ইসলামে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তা

প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও নিম্ন আয়ের মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসলাম যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তার কয়েকটি হলো—

জাকাত : ইসলামী শরিয়তে জাকাত ফরজ ইবাদত। অসহায় মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যার উদ্দেশ্য। বিধান মতে, প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তি শর্ত সাপেক্ষে সম্পদের ৪০ ভাগের এক ভাগ অসহায় মানুষকে প্রদান করে থাকে। আট শ্রেণির মানুষ এই অর্থ পেয়ে থাকে। ইরশাদ হয়েছে, ‘জাকাত কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত ও তত্সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জন্য, যাদের চিত্তাকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণে ভারাক্রান্তদের, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের জন্য। এটা আল্লাহর বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৬০)

সাদকাতুল ফিতর : ঈদুল ফিতরের দিন সকালে সামর্থ্যবান ব্যক্তি, যিনি সাড়ে সাত ভরি সোনা বা সাড়ে ৫২ ভরি রুপা বা সমমূল্যের সম্পদের মালিক তার জন্য নিজের ও পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব। জাকাত গ্রহণ করতে পারেন এমন ব্যক্তি সদকাও গ্রহণ করতে পারেন। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) সাদকাতুল ফিতর অপরিহার্য করেছেন। এর পরিমাণ হলো, এক সা জব বা এক সা খেজুর। ছোট-বড়, স্বাধীন-পরাধীন সবার ওপরই এটি ওয়াজিব। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৫১২)

নফল দান : জাকাত ও সাদকাতুল ফিতর ছাড়াও ইসলাম সমাজের অসহায় মানুষকে দান করতে উৎসাহিত করেছে। যেন তারা স্বস্তির জীবন যাপন করতে পারে। ইরশাদ হয়েছে, ‘লোকেরা কি ব্যয় করবে সে সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বলুন! তোমরা যে ধন-সম্পদ ব্যয় করবে তা পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন ও মুসাফিরদের জন্য।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৬৭)

নিঃশর্ত ঋণ সহায়তা : মানুষের প্রয়োজনে বিনা শর্তে অর্থ ও কোনো পণ্য ঋণ দেওয়াকে করজে হাসানা বলে। ইসলাম অন্যের দুর্দিনে এভাবে ঋণ দিয়ে সহায়তা করতে উৎসাহিত করেছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘কে সে, যে আল্লাহকে দেবে উত্তম ঋণ? তা হলে তিনি তা বহু গুণে বৃদ্ধি করবেন তার জন্য এবং তার জন্য রয়েছে সম্মানজনক পুরস্কার।’ (সুরা হাদিদ, আয়াত : ১১)

ওয়াক্ফ : ওয়াক্ফ হলো কোনো সম্পদ কারো মালিকানায় অর্পণ না করে তার সুবিধা ভোগ করার সুযোগ করে দেওয়া। সাধারণ মুসলিম ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ উভয় শ্রেণি দানকারীর ইচ্ছা অনুযায়ী ওয়াক্ফকৃত সম্পদ দ্বারা উপকৃত হতে পারে। ওমর (রা.) খায়বারের একখণ্ড ভূমি লাভ করার পর তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে পরামর্শ চাইলে তিনি বলেন, ‘তুমি মালিকানা হাতে রেখেও তা দান করতে পারো।’ ওমর (রা.) তা বিক্রয়, দান ও উত্তরাধিকার সূত্রে হস্তান্তর না করার শর্তে দান করেন, যা দ্বারা অসহায় ও দুস্থ মানুষ উপকৃত হতো। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৩৯৬)

তাকাফুল : তাকাফুল একটি সামাজিক সুরক্ষা পদ্ধতি। যাতে সামাজিক সুরক্ষার জন্য একটি সামাজিক তহবিল গঠন করা হয় এবং সমাজের কেউ বিপদগ্রস্ত হলে তাকে সেই তহবিল থেকে সহায়তা করা। পারস্পরিক সহায়তার ব্যাপারে বর্ণিত আয়াত ও হাদিসের আলোকে ইসলামী আইনজ্ঞরা এই পদ্ধতিকে বৈধ বলেন। (আল-ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু : ৭/৩৮)

দুর্দিনে বাড়ে দায়িত্ব

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি দুনিয়ায় কোনো মুমিনের কোনো অসুবিধা দূর করে দেয়, আল্লাহ তার পরকালের অসুবিধা দূর করে দেবেন। যে কোনো মুসলমানের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখেন। যে পর্যন্ত বান্দা তার ভাইকে সাহায্য করতে থাকে সে পর্যন্ত আল্লাহ তাকে সাহায্য করতে থাকেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৪২৫)

আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন। আমিন।

আরও সংবাদ

Back to top button