ব্যবসা

বেনাপোল দিয়ে রেলকার্গোয় আমদানিতে এনবিআরের অনুমতি

এখনই সময় :

অবশেষে বেনাপোল দিয়ে পণ্য আমদানিতে ব্যবসায়ীদের স্বস্তি আসছে। রেলকার্গোতে এখন থেকে ভারত থেকে সবধরনের পণ্য আমদানি করতে পারবে ব্যবসায়ীরা। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কোভিড-১৯ সংক্রমনকালে ভারত থেকে আমদানি পণ্য চালানে বেনাপোলে রেলকার্গো হ্যান্ডলিংয়ের অনুমতি দিয়েছে। কিছু শর্ত সাপেক্ষে সবধরনের পণ্য ভারত থেকে সাইডডোর (পাশে দরজা বিশিষ্ট) রেলকার্গোর মাধ্যমে আনার অনুমতি দেয়া হয়। বেনাপোল কাস্টম হাউজের কমিশনার মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর ফলে কমবে ট্রাক চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য, ব্যবসায়ীদের সময় সাশ্রয় হবে ও খরচ কমবে।

মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরী বলেন, বেনাপোল-পেট্রাপোলের সকল অংশীজন এনবিআরের আদেশের আলোকে নিজ নিজ পণ্য বা কার্গো আমদানি করতে করতে পারবেন। পূর্বে কেবল বাল্ক কার্গো যেমন পাথর, পাথর চিপস্, ধান, চাল, গম রেলে আমদানি হতো। এখন থেকে সব রকমের পণ্য পণ্যবাহী ট্রেনে করে আনা যাবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, করোনার শুরুতে ২২ মার্চ থেকে বেনাপোল-পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। পরে দু’দেশের উর্ধ্বতন মহল ও বন্দর ব্যবহারকারী সংগঠনের কয়েক দফা বৈঠকে আমদানি-রপ্তানি চালু করার নির্দেশনা দিয়েও চালু করা যায়নি। এর পেছনে বনগাঁ ও পেট্রাপোলে ট্রাক থেকে চাঁদাবাজিকে দায়ী করা হয়। এমনকি গুজব ছড়ানো হয় বেনাপোল দিয়ে প্রচুর করোনা রোগী সেদেশে প্রবেশ করছে এবং বেনাপোলে অনেকে করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়েছে।

সর্বশেষ বেনাপোল কাস্টম রেলকার্গোতে ধানবীজের একটি চালান ১০ মিনিটে শুল্কায়ন করে রেকর্ড করে। এ নিয়ে এনবিআরসহ বিভিন্ন মহলের দৃষ্টিতে আসে। এমন পরিস্থিতিতে রেলকার্গোতে পণ্য পরিবহনের অনুমতি দিতে বেনাপোল কাস্টম হাউস বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও এনবিআরকে চিঠি দেয়। এছাড়া ভারতীয় হাইকমিশন বাংলাদেশ অনুরোধ জানায়। এরই প্রেক্ষিতে এনবিআর এ অনুমতি দিয়েছে।

অনুমতি আদেশে বলা হয়, ৪ মে কোভিড-১৯ সংক্রমনকালীন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য রেলপথে পরিবহনের বিষয়ে ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের উদ্যোগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ রেলওয়ে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও এনবিআরের সঙ্গে একটি ভিডিও সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে ভারতের পক্ষ থেকে রেলপথে সকল ধরনের পণ্য আমদানিতে সহায়তার অনুরোধ করা হয়। বিষয়টি পরীক্ষা করে মতামত প্রদানের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে আহ্বায়ক করে টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তর প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত কমিটি কয়েকটি সুপারিশ করে প্রতিবেদন দাখিল করে। সুপারিশের মধ্যে অন্যতম হলো বেনাপোল-পেট্রাপোল রুটে পার্শ্ব-দরজা বিশিষ্ট কন্টেইনার ট্রেন চালুর অনুমতি প্রদান। সুপারিশের আলোকে ছয়টি শর্তসাপেক্ষে এ অনুমতি প্রদান করা হলো।

শর্তের মধ্যে বলা হয়, বেনাপোল কাস্টম হাউসকে রেলপথে আমদানি করা পণ্যের কাস্টমস প্রক্রিয়া সম্পন্নের একটি আর্দশ পদ্ধতি প্রণয়নপূর্বক এনবিআরকে অবহিত করতে হবে। পণ্য আমদানির পূর্বে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ রেলওয়ের মাধ্যমে বন্দর অভ্যন্তরে পণ্যের অবতরণ, সংরক্ষণ ও কায়িক পরীক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতকল্পে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণসহ প্রয়োজনীয় পূর্তকাজ সম্পন্ন করতে হবে।

আরো রয়েছে সকল পণ্য সহকারী কমিশনার বা উপকমিশনারের উপস্থিতিতে শতভাগ কায়িক পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ঘোষণার যথার্থতা যাচাই ও যথাযথ শুল্ককর আদায় নিশ্চিতকল্পে আইনানুগ সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আমদানি নীতি আদেশসহ সকল আইন ও বিধি-বিধান পরিপালন করতে হবে। কোভিড-১৯ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সাইড ডোর কন্টেইনার ট্রেন চলাচলের বিষয়টি পুনঃপর্যালোচনা করতে হবে। এ লক্ষে রেলপথে আমদানি-রপ্তানির তথ্য নিয়মিতভাবে এনবিআরকে অবহিত করতে হবে।

সূত্র আরো জানায়, রেলকার্গোর মাধ্যমে পণ্য আমদানির নানাবিধ সুবিধা রয়েছে। ট্রেন আগমন থেকে ছেড়ে যাবার লিডটাইম নুন্যতম এক পঞ্চমাংশ। এক ওয়াগন ৪ ট্রাকের সমান পণ্য আনতে পারে। রেলকার্গোতে মিথ্যা ঘোষণার সুযোগ কম। ট্রেনে ভাড়া ট্রাকের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। আবশ্যিক পার্কিং, ট্রাকের দীর্ঘসময় অপেক্ষা ও চাঁদা নেই। দিনে ১০০ বগির একটি ট্রেনে ৪০০ ট্রাকের পণ্য আনা যায়।

রেলকার্গোতে অন্যান্য সুবিধার মধ্যে রয়েছে মিথ্যা, অপঘোষণা, চোরাচালানের সুযোগ প্রায় নেই, পণ্য বোঝাই সরকারি ও খোলা জায়গায় হয়। ট্রাকে আনা বাণিজ্যিক পণ্যের ক্রেতা, সিএন্ডএফ, ট্রাকের, বন্দরের, কাস্টমসের, সরকারি বেসরকারি অনেককে পাহারা দিতে হবে না। শিল্প, বহুজাতিক ও সুনামধারী প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস করে চালবীজের মতো দশ মিনিটে রিলিজ অর্ডার ইস্যু, বেনাপোল স্থলবন্দরের স¶মতা দ্বিগুণ হবে। কাস্টমস ও বন্দরে বাড়তি লোকবল ছাড়াই দ্বিগুণ পণ্য ছাড় করতে পারবে। শুল্কায়ন ও খালাস কয়েকদিনের পরিবর্তে কয়েক ঘন্টায় হবে। আমদানি পণ্য অভিপ্রেত কম সময়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছে যাবে।

ইন্দো-বাংলা চেম্বার অফ কমার্স সাব কমিটির পরিচালক মতিয়ার রহমান জানান, স্বাধীনতার পর কিছুদিন রেলকার্গোতে পণ্য বেনাপোলে এসেছে। এরপর বেনাপোলে রেলকার্গো হ্যান্ডলিং বন্ধ। উদ্দেশ্য ভারতের পার্কিং সিন্ডিকেটের বাণিজ্য ও চাঁদাবাজি। পরে ১৯৯৯ সালে বেনাপোল রেলপথে ভারতের সঙ্গে আমদানি বাণিজ্য শুরু হয়। দেশের ৩০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যের অর্ধেকও ট্রেনে হলে আমদানি ব্যয় ও সময় কমে যাবে।

বেনাপোল কাস্টম ক্লিয়ারিং এন্ড ফরোয়ার্ডিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন বলেন, এশিয়ান হাইওয়ের ট্রানজিট করিডোরের ‘প্রথম গেটওয়ে’ বেনাপোল। ভারতের সাথে এই বন্দর দিয়ে প্রতিবছর ৩০০ কোটি টাকার পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়। এখান থেকে সরকার প্রতি বছর সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার রাজস্ব পেয়ে থাকে। “শুন্যরেখা থেকে বেনাপোল রেল স্টেশন পর্যন্ত দুই কিলোমিটার রেলপথ বেনাপোল বন্দরের মধ্য দিয়ে এসেছে। এখানে সামান্য ভূমি উন্নয়ন করলে রেল কন্টেইনার হ্যান্ডলিং উপযোগী হবে। বেনাপোল বন্দরের প্রায় ১০০ একর জায়গার মধ্যে ২০ একর জায়গা আছে যা হেভি কম্পেকশনসহ ৪০ ফুট লোড কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করার উপযোগী।”

করোনায় বেনাপোল-পেট্রাপোল বন্দর বন্ধ থাকায় সম্প্রতি চাল, গম, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, শুকনা ঝাল ও ফ্লাই অ্যাশের চালান রেলওয়াগনে আসায় ব্যবসায়ীদের দৃষ্টি খুলে যায়। এখন দেশের ব্যবসায়ীরা বড়ধরনের চালান রেলে আনতে আগ্রহী এবং ভারতের রপ্তানিকারকরাও বনগাঁ পেট্রাপোলের গেড়াকল থেকে মুক্তি পাবে। তবে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থে বেনাপোলে রেলকার্গো খালাসের নীতিমালা দ্রুত জারি করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। রেলকার্গো চালুর অনুমতি দেয়ায় বেনপোলের শিল্প শ্রেণির ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোসহ সর্বস্তরের ব্যবসায়ী ও অংশীজনরা এনবিআরসহ সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানিয়েছে।

আরও সংবাদ

Back to top button