ধর্ম

অবৈধ মানবপাচার রোধে ইসলাম

এখনই সময় :

উন্নত জীবনের আশায় চোখে হাজার স্বপ্ন নিয়ে ইউরোপ যাওয়ার পথে লিবিয়ায় প্রাণ হারায় ২৬ বাংলাদেশি। এ ঘটনায় গোটা বাংলাদেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এভাবে মানবপাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার পথে জিম্মি হতে হয় হাজার মানুষকে। কাউকে আবার বিক্রি করে দেওয়া হয় জাহেলি যুগের গোলামের মতো। কেউ মুক্তিপণ দিয়ে হয়তো ফিরে আসতে পারে, কাউকে আবার পাচারকারীদের হাতে জীবন দিতে হয়। কেউ কেউ অবশ্য দুর্ঘটনার শিকার হয়েও মৃত্যুবরণ করে।

অথচ ইসলাম মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা জীব ঘোষণা করেছে। ইসলামের সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসলাম ইনসাফ, সাম্য ও মানবিক মর্যাদার ধারণাকে সমুন্নত রেখেছে। মানুষের মর্যাদা ও অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। একশ্রেণির মানুষরূপী পশু নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার জন্য মানুষকে পণ্য করার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে সেই আদিকাল থেকেই। রাতারাতি বড়লোক হওয়ার স্বপ্নে তারা বেছে নিয়েছে মানবপাচারের মতো ঘৃণ্য ব্যবসা। যুগের পরিবর্তনে কেবল কাজের ধরন পাল্টালেও মানুষকে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করার অসংখ্য পথ ও পন্থা তারা আবিষ্কার করেছে। অথচ জাহেলি যুগে এ ঘৃণ্য কাজটিকে ইসলাম সমূলে উৎপাটন করে দিয়েছিল। রাসুল (সা.) পৃথিবী থেকে দাসপ্রথা উচ্ছেদের সূচনা করে মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলিম গোলাম আজাদ করবে, আল্লাহ তাআলা সেই গোলামের প্রত্যেক অঙ্গের বিনিময়ে তার মুক্তিদাতার একেকটি অঙ্গ জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করে দেবেন।’ (বুখারি, হাদিস : ২৩৫১)

অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, কেয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির প্রতিপক্ষ হব, আর আমি যার প্রতিপক্ষ হব, সে নিশ্চিত পরাভূত হবে। তন্মধ্যে একজন হলো, যে একজন স্বাধীন লোককে বিক্রয় করে টাকা গ্রহণ করে থাকে।’ (সুনানুল বাইহাকি, হাদিস : ১১০৫৩)

এভাবে মানবপাচারের ব্যবসা যেমন বেআইনি, তেমনি নিজের জীবনকে শঙ্কায় ফেলে এভাবে বিদেশ গমনও ইসলাম সমর্থন করে না। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নিজের হাতে নিজেকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ কোরো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৯৫)। এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, নিশ্চিত জীবনের ঝুঁকি আছে এমন কাজে পা বাড়ানো যাবে না। অবৈধভাবে মানবপাচারকারীদের মাধ্যমে বিদেশ গমন তেমনই একটি কাজ।

২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রায় ২০ লাখ মানুষ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা করেছে। এতে করে সাগরেই মারা গেছে প্রায় ১৯ হাজার মানুষ। যার মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা শীর্ষে। এ বছর জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যাত্রার পথে আটক হয়েছেন ৬৯৩ জন বাংলাদেশি। (সূত্র : নিউজ টোয়েন্টিফোর)

২০১৫ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে বছর মে মাসে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ থেকে মানবপাচারকারীরা মালয়েশিয়ায় নেওয়ার কথা বলে প্রায় পাঁচ হাজার শরণার্থী ও অভিবাসীকে বঙ্গোপসাগর এবং আন্দামান সাগরে ফেলে চলে যায়। তাঁদের মধ্যে ৭০ জন সাগরে ভাসমান জাহাজেই মারা যান। তাঁদের সবাই ক্ষুধা, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। পাশাপাশি ট্রলারের জলদস্যুদের নির্যাতন ও সমুদ্রের পানিতে ডুবেই মারা গেছেন অনেকে। (দেশ রূপান্তর)

দ্য ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব মাইগ্রেশন-আইওএমের ‘মিসিং মাইগ্রেন্টস প্রজেক্ট ২০১৯’-এর হিসাবে, ১ জানুয়ারি ২০১৪ থেকে ২২ অক্টোবর ২০১৯ পর্যন্ত অবৈধ অভিবাসনের সময় ৩৩ হাজার ৬৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আইওএম স্পষ্ট করেই বলছে, এটি বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া খণ্ডিত চিত্র। মৃত ও নিখোঁজের আসল তথ্য অজানা। (চ্যানেল আই অনলাইন)

এত কিছুর পরও বহু দরিদ্র পিতা-মাতা অর্থ উপার্জনের আশায়, বেশি বেতনের চাকরির প্রলোভনে পড়ে কিংবা সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে না জেনে-শুনে নিজেই আদরের সন্তানটিকে তুলে দিচ্ছে পাচারকারীদের হাতে। এমনকি পাচারকারীদের হিংস্রতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না নিষ্পাপ শিশুরাও। উটের জকি, অবৈধ অস্ত্র, মাদকদ্রব্য, চোরাচালানের বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে পবিত্র শিশুদের। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অঙ্গহানি করে তাদের দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করানোর ব্যাপারটাও বেশ পুরনো। এতে একদিকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে তাদের মৌলিক অধিকার থেকে, অন্যদিকে বঞ্চিত হচ্ছে নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকেও। মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত হওয়ার কারণে দেশ ও জাতির মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলে তারাই একসময় গড়ে ওঠে আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক একটি কালো সৈনিকরূপে, যারা প্রতিনিয়ত আত্মনিয়োগ করে দেশ ও জাতিকে ধ্বংসের কাজে।

আর নারীদের অবস্থা আরো ভয়াবহ। বাংলাট্রিবিউনের একটি প্রতিবেদনে উঠে আসে, ‘সোনালি ভবিষ্যতের আশায় চাকরি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গিয়ে বেশির ভাগ নারীই পড়ছেন পাচারকারীর কবলে। পরে বাধ্যতামূলকভাবে দেহব্যবসা করতে বাধ্য করা হয়। কাউকে জিম্মি করে স্বজনদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করেন দেশি-বিদেশি পাচারকারীরা। ওই দুষ্টচক্রের কবল থেকে নানা কৌশলে পালিয়ে আসতে সক্ষম হলেও বেশির ভাগ নারীরই ভাগ্যে কী ঘটছে জানার উপায় থাকে না। ওই সব নারী বেঁচে আছেন না মারা গেছেন, তা জানেন না স্বজনরা। কোথায় কার কাছে প্রতিকার চাইতে হবে, সেটাও জানেন না তারা।’

এভাবে নারী ও শিশুদের অন্ধকারের পথে ঠেলে দেওয়া যেমন রাষ্ট্রের জন্য হুমকি, তেমনি ইসলামেও তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর এর চেয়ে বড় জুলুম আর কী হতে পারে? রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘এক মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করবে না এবং তাকে জালিমের হাতে সোপর্দও করবে না।’ (বুখারি, হাদিস : ২২৮০)।

অতএব কোনো মুমিন যেমনিভাবে মানবপাচারের মতো ঘৃণ্য ও অবৈধ কাজে আত্মনিয়োগ করতে পারে না। তেমনি কাউকে মানবপাচারকারীদের হাতেও তুলে দিতে পারে না।

আমাদের সবার উচিত এ বিষয়ে নিজে সচেতন হওয়া এবং অন্যকে সচেতন করা। উন্নত জীবনের আকাশকুসুম স্বপ্ন যেন আমাদের প্রিয়জনদের জীবন কেড়ে না নেয়, অথবা তাদের দাস কিংবা যৌনদাসী না বানিয়ে ফেলে।

জীবিকার টানে যদি ভিনদেশে যেতেই হয়, তবে অবশ্যই দক্ষতা অর্জন করে বৈধ পথে যাওয়া উচিত। এতে করে পরিবারে যেমন সচ্ছলতা আসবে, তেমনি আমাদের প্রিয়জনরা পাবে নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা।

Related Articles

Back to top button
Close