ধর্ম

পৃথিবীর প্রাচীন ধর্মগুলোতে রোজা

এখনই সময় :

আধ্যাত্মিক সাধনা হিসেবে রোজা বা উপবাস পৃথিবীর প্রায় সব প্রাচীন ধর্মে স্বীকৃত। যদিও প্রত্যেক ধর্মের রোজার রূপরেখা ও বিধি-বিধান ভিন্ন ভিন্ন, তবু মৌলিকত্বের বিচারে সবার ভেতর কিছু অভিন্নতা খুঁজে পাওয়া যায়। বিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট দায়ি ও চিন্তাশীল আলেম সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভি (রহ.) তাঁর ‘আরকানে আরবাআ’ বইয়ে পৃথিবীর প্রধান প্রধান ধর্মের রোজার রূপরেখা তুলে ধরেছেন। গুরুত্বপূর্ণ লেখাটির ভাষান্তর করেছেন আতাউর রহমান খসরু

হিন্দু ধর্মে রোজা

পৃথিবীর যেসব প্রাচীন ধর্ম, ইতিহাস ও সভ্যতায় ধর্মীয় রীতি ও নিয়ম হিসেবে রোজার ধারণা পাওয়া যায়, ভারতবর্ষের হিন্দু (সনাতন) ধর্ম তার অন্যতম। হিন্দু ধর্মের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি টি এম পি মহাদেবান—যিনি মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগেরও প্রধান হিন্দু ধর্মের রোজা (উপবাস) সম্পর্কে লেখেন, (সনাতন ধর্মের) যেসব বার্ষিক উৎসব রয়েছে, তার কয়েকটির মধ্যে রোজাও (উপবাস ব্রত) নির্ধারিত। যা আত্মশুদ্ধির জন্য করা হয়। প্রত্যেক হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা পূজা ও প্রার্থনার জন্য কিছু দিন নির্ধারণ করে, যেসব দিনে তাদের বেশির ভাগ মানুষ রোজা রাখে। আহার গ্রহণ থেকে বিরত থাকে। রাত জেগে নিজের ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠ করে এবং ধ্যান করে। এসব উৎসবের ভেতর সবচেয়ে প্রসিদ্ধ উৎসব হলো বৈকুণ্ঠ একাদশী। যা দেবতা বিষ্ণুর সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে শুধু বিষ্ণুর পূজারিরা নয়; সনাতন ধর্মের অন্য দেবতার পূজারিরাও এই দিনে উপবাস ব্রত লালন করে। বৈকুণ্ঠ একাদশী উৎসবে দিনে উপবাস পালন করা হয় এবং রাতে পূজা-অর্চনা হয়। কিছুদিন এমন, যা নারীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। নারীরা এমন সব দেবীর পূজা করে, যারা ভগবানের নারীবৈশিষ্ট্য নিয়ে বিভিন্ন রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। গুরুত্ব বোঝাতে যাকে ব্রত বলা হয়—যা আত্মশুদ্ধি ও আত্মিক উন্নতির জন্য পালন করা হয়। (আউটলাইনস অব হিন্দুজম, চ্যাপ্টার ৪, সেকশন ৬)

গ্রিক ও পার্সি ধর্মে রোজা

মাওলানা সাইয়েদ সোলাইমান নদভি (রহ.) সিরাতুন নবীর পঞ্চম খণ্ডে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার সূত্রে লিখেছেন, প্রাচীন মিসরের উৎসবগুলোর মধ্যে রোজাসহ অন্যান্য ধর্মীয় বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রাচীন গ্রিকের নারীরা শুধু ‘থেসমোফেরিয়া’র তৃতীয় দিনে রোজা রাখত। পার্সি ধর্মে সাধারণভাবে রোজা ফরজ নয়, তবে তাদের ধর্মীয় গ্রন্থের একটি ‘উদ্ধৃতি’ থেকে বোঝা যায়, পার্সি ধর্মে রোজা ছিল। বিশেষত ধর্মীয় নেতাদের জন্য পঞ্চবর্ষীয় রোজা আবশ্যক ছিল। (সিরাতুন নবী : ৫/২১২)

ইহুদি ধর্মে রোজা

ইহুদি ধর্মে প্রাচীনকাল থেকে রোজার দিন নির্ধারিত। এটা তাদের কাফফারার রোজার ভিন্ন—যা মুসা (আ.)-এর অনুসারীরা একদিন পালন করে থাকে। তাদের ভেতর ধারাবাহিক রোজার প্রচলনও রয়েছে—যার সম্পর্ক প্রাচীন বিভিন্ন ঘটনা ও পরিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে। যেমন ব্যাবিলনীয় যুগের বন্দিত্বকাল—যাতে চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ মাস (মে, জুন ও জুলাই) এবং দশম মাস (অক্টোবর) অন্তর্ভুক্ত, তামুদের কিছুসংখ্যক আলেমের মতে, দাসত্বের কালে এই সময় রোজা রাখা আবশ্যক আর স্বাধীন সময়ে তা ঐচ্ছিক।

অনেক রোজা ইহুদি ধর্মপণ্ডিতদের নিয়ন্ত্রণাধীন। তাঁরা দুর্ভিক্ষ, ভয়, বিপদ, বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় আইন ও বালা-মসিবত থেকে বাঁচতে সাধারণ অনুসারীদের ওপর নানা সময় এসব রোজা আবশ্যক করে দেন। ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণ, সমস্যা থেকে মুক্তি, অতীত পাপের মার্জনা ও আল্লাহর সাহায্য লাভের জন্য ইহুদিদের রোজা রাখার অবকাশ আছে। ইহুদি ধর্মে সাধারণত ইশরাকের সময় থেকে রাতের প্রথম তারা উদিত হওয়া পর্যন্ত রোজা রাখা হয়। কাফফারার রোজা—যা সপ্তম মাসের দশম দিনে রাখা হয় এবং হাইকালে সোলাইমানিতে প্রথম বা দ্বিতীয়বার অগ্নিসংযোগের ঘটনা স্মরণ করে মে মাসের নবম দিনে যে রোজা রাখা হয়, তা এক সন্ধ্যা থেকে আরেক সন্ধ্যা পর্যন্ত পালন করা হয়। সাধারণ রোজার জন্য বিশেষ কোনো বিধি-নিষেধ নেই। তবে রোজা পালনের সময় দান করা ও দুস্থ মানুষদের খাওয়ানোর ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। (তথ্যসূত্র : জিউস এনসাইক্লোপিডিয়া)

খ্রিস্ট ধর্মে রোজা

ঈসা (আ.) তাঁর নবুয়তের সূচনায় ৪০ দিন রোজা রাখতেন—তা ছিল কাফফারার সেই রোজা, যা মুসা (আ.)-এর শরিয়তে ফরজের পর্যায়ে ছিল। একজন একনিষ্ঠ ইহুদি যেভাবে এই রোজা রাখে, তিনি ঠিক সেভাবেই রাখতেন। তবে রোজার বিস্তারিত কোনো বিধান তিনি বর্ণনা করে যাননি। তিনি শুধু মৌলিক বিধান বর্ণনা করেন এবং তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ধর্মীয় মূলনীতির ওপর ছেড়ে দেন। খ্রিস্ট ধর্মের গ্রন্থ ও উৎসগুলোয় ‘পলস’-এর রোজার বর্ণনা পাওয়া যায়। তাতে এ কথাও বলা হয়েছে, প্রাথমিক যুগে ইহুদি বংশোদ্ভূত খ্রিস্টানরা এই রোজা ইহুদিদের কাফফারার রোজার সঙ্গে মিলিয়ে রাখত। পাদ্রি লুকও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু খ্রিস্টানরা তাদের অন্য যেসব মূলনীতির কথা বলে তা উল্লেখ করেননি।

পলের মৃত্যুর দেড় শ বছর পর খ্রিস্ট সমাজে রোজার সুনিয়ন্ত্রিত বিধান প্রণয়নের জোর প্রচেষ্টা শুরু হয়। বহু পাদ্রি ও গির্জার নিয়ন্ত্রক প্রবৃত্তির তাড়না নিয়ন্ত্রণের জন্য রোজার ওপর গুরুত্ব দেন। ‘ইরিন্স’ রোজাকে এভাবে ভাগ করেন যে রোজা এক দিনেরও হয়, দুই দিনেরও হয়, আবার ধারাবাহিক ৪০ ঘণ্টারও হয়। বেশ কিছুদিন পর্যন্ত খ্রিস্ট সমাজে এভাবেই রোজা চর্চিত হতে থাকে। ফ্রাইডে অব সোরজ বা দুঃখের শুক্রবারের রোজা ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে এবং খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতক পর্যন্ত যা বিভিন্ন রাষ্ট্রে প্রচলিত ছিল। রোজার বিধান ও নিয়ম-নীতি প্রণয়নের কাজ সবচেয়ে বেশি হয়েছে খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ের মধ্যে। সে সময় গির্জা থেকে একটি বিধান ও নির্দেশনা জারি করা হয়। চতুর্থ শতকে রোজার ব্যাপারে কঠোরতা অনেক বেশি বেড়ে যায়। ফলে তা সহনীয় পর্যায়ে আনার জন্য বড়দিনের আগে দুদিন রোজার জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়—যা মধ্যরাতে শেষ হতো। অসুস্থতার কারণে যারা এ দুই দিন রোজা রাখতে অপারগ ছিল, তাদের শনিবার রোজা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়। খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকে রোজার দিন নির্ধারণ করা হয়। রোজার শেষ সময় নিয়েও মতভিন্নতা ছিল। কেউ মোরগ ডাকার সঙ্গে ইফতার করত এবং কেউ কেউ অন্ধকার গভীর হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করত।

ভৌগোলিক ও পরিবেশ-প্রতিবেশের পার্থক্যের কারণেও রোজা পালনের ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। যেমন রোমানদের রোজা থেকে ‘ইস্কান্দারিয়া’ ও ‘লামানে’র রোজা ভিন্ন ছিল। কেউ কেউ পশুর গোশত হারাম মনে করত, আবার কেউ কেউ তা বৈধ মনে করত। কেউ শুধু মাছ ও পাখির গোশত পরিহার করত এবং কেউ ডিম ও ফল পরিহার করত। কেউ শুধু শুকনো রুটি খেত এবং কেউ তা-ও খেত না। এ ছাড়া এক রাষ্ট্রের রোজা থেকে অন্য রাষ্ট্রের রোজার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। (প্রবন্ধ : ফাস্টিং ক্রিশ্চিয়ান এবং এনসাইক্লোপিডিয়া অব রিলিজিয়ন অ্যান্ড ইথিকস)

(সংক্ষেপিত)

আরও সংবাদ

Back to top button