আন্তর্জাতিক

‘মাকে তো বলে আসিনি’ বলল করোনায় মৃত্যুপথযাত্রী!

এখনই সময় :

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্রিটেনের হাসপাতালগুলো এখন যুদ্ধক্ষেত্র। এই যুদ্ধের একেবারে সামনের কাতারে আছেন জরুরি বিভাগের স্বাস্থ্যকর্মীরা। ডা. বিশ্বজিৎ রায় কাজ করছেন লন্ডনের উলউইচে কুইন এলিজাবেথ হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে। করোনাভাইরাসের মহামারীতে প্রতিদিন তাদের কাছে অবিরাম আসছে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা বহু রোগী। এসব মানুষের জীবন বাঁচাতে তাদের প্রতিদিনের লড়াইয়ের কথা উঠে এসেছে বিবিসি বাংলায়।

খুব কঠিন একটা দিনের কথা দিয়ে শুরু করি। সেদিন আমার শিফট শুরু হয়েছিল সকাল দশটায়। সেদিন আমার ডিউটি ক্রিটিক্যাল কেয়ারে। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর আমার কনসালট্যান্ট চিকিৎসক আমাকে ডাকলেন। বললেন, তুমি ক্রিটিকাল কেয়ারে যাচ্ছো, তোমাকে জানিয়ে রাখি, দুজন পেশেন্ট আসবে। পথে আছে।

হাসপাতালের ক্রিটিকাল কেয়ারে অ্যাম্বুলেন্সে যখন রোগী আসে, অ্যাম্বুলেন্স কর্মীরা আমাদের আগেই আগাম বার্তা দিয়ে রাখে। যাতে আমরা সব প্রস্তুত রাখতে পারি। পেশেন্ট আসার সঙ্গে সঙ্গে রিসিভ করে যাতে আমরা ট্রিটমেন্ট শুরু করে দিতে পারি। রোগী সম্পর্কে যতটুকু জানলাম, তা হলো, বয়স ৪৩। বাসায় ছিল। তার প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট। কথা বলতে পারছে না। আমি তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে রিসাসিটেশন ডিপার্টমেন্টে ঢুকে গেলাম।

দশ মিনিট পরেই রোগী আনা হলো। খুব সুঠাম দেহী। অ্যাম্বুলেন্সের কর্মীরা আমাকে জানালেন, রোগী একটু ডায়াবেটিক, কিন্তু নিয়মিত ঔষধ নেয়। নিয়মিত ব্যায়াম করে।

যখনই কোন রোগীর শ্বাস কষ্ট হয়, তার অক্সিজেনের মাত্রাটা আমরা মেপে নেই। দেখা যাচ্ছে যে এই রোগীকে হাই ফ্লো অক্সিজেন দেয়ার পরও তার অক্সিজেন স্যাচুরেশন আকাঙ্খিত লেভেলে নেই। হাই ফ্লো অক্সিজেন দিলে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা ৯০/৯৫ এর উপরে থাকা উচিৎ, কিন্তু এই রোগীর বেলায় তা ৮২/৮৩তে। কখনো ৭০ এ নেমে যাচ্ছে। এটা খুবই উদ্বেগের ব্যাপার।

তখন আমি সাথে সাথে আমাদের অন্য সহকর্মীদের ডেকে আনলাম। সবাই চলে আসলো। রোগীর অবস্থা দেখে আমরা ঠিক করলাম, তাকে ইনটিউবেট (শ্বাসনালীতে টিউব ঢোকানো, যাতে করে ভেন্টিলেটরের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস চালু রাখা যায়) করতে হবে।

রোগীর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু তখনো তার চেতনা আছে। তাকে আমরা বোঝালাম, তোমার ভালোর জন্য আমরা তোমাকে ইনটিউবেট করবো এবং কৃত্রিমভাবে ফুসফুসে অক্সিজেন সাপ্লাই দেয়া হবে। সেজন্য তোমাকে অচেতন করার দরকার হবে। রোগী তখন আমাকে বললো, আমার মা আছে। আমার মাকে আমিই দেখাশোনা করি। আমার মাকে কিন্তু আমি কিছু বলে আসতে পারিনি।

কথাটা আমার মনে খুব ধাক্কা দিল। এরকম একজন মানুষ, তার মাকে ঠিকমত বলে আসতে পারেনি, জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে এই লড়াইয়ের সময় সেটাই তার সবার আগে মনে হচ্ছে।

দশ মিনিটের মধ্যে অ্যানেসথেসিস্ট চলে আসলো। রোগীকে অচেতন করে ইনটিউবেট করা হলো। ইমার্জেন্সি থেকে পরে তাকে পাঠিয়ে দেয়া হলো আইসিইউতে।

এই রোগীর অবস্থা সম্পর্কে আমি পরে খবর নিয়েছি। এখনো ভেন্টিলেটরে আছে। তার কিডনি ঠিকমত কাজ করছে না। হিমোফিলট্রেশন করতে হচ্ছে। এটা উদ্বেগের।

আমার এখনো কানে বাজছে তার কথাগুলো। সে বলেছিল, মায়ের প্রতি আমার অনেক দায়িত্ব। মাকে বলে আসতে পারিনি। আমি এই লোকটির জন্য প্রার্থনা করি। প্রার্থনা করি, বিধাতা যেন এই লোকটিকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসে।

আরও সংবাদ

Back to top button