ব্যবসা

করোনায় রঙ ফিকে হালখাতার

এখনই সময় :

বাংলা নববর্ষ বলতে চোখের সামনে ভেসে ওঠা লাল শালু মোড়ানো হালখাতা। সময়ের ধারাবাহিকতায় আর প্রযুক্তির ভিড়ে এর জৌলুস কিছুটা হারালেও করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব আর লকডাউনের জেরে পুরোপুরিই হারিয়ে গেল সেই লাল খাতার আবেদন। এই বিপর্যয় শুধু নববর্ষের আনন্দই ম্লান করেনি; পুরো দেশের স্বর্ণ ব্যবসার সোনালি রঙ করে দিয়েছে ফিকে। এমনভাবেই কথাগুলো দেশের বললেন দেশের প্রবীণ স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও বাংলাদেশে জুয়েলারি সমিতির সাবেক সভাপতি ও ভেনাস জুয়েলার্সের চেয়ারম্যান গঙ্গাচরণ মালাকার (জেসি মালাকার)।

আজ সোমবার স্বর্ণ ব্যবসায় করোনার প্রভাব নিয়ে জানতে চাইলে জেসি মালাকার কালের কণ্ঠকে বলেন, এই খাতের উদ্যোক্তাদের নতুন বছরের আয়োজনে ছিল না কোনো কমতি। মিষ্টি, ফুল-ফল, কার্ড আর উপহারের সব আয়োজনই ছিল। কিন্ত সব উদ্যেগ ভেস্তে গেল। ফলে আয়োজনে করা বিনিয়োগসহ নতুন বছরে পাওনা আদায় থেকেও বঞ্চিত হলো তারা।

জেসি মালাকার বলেন, বাংলা সনের প্রথম দিনে এক সময় আমরা দোকানপাটের হিসাব আনানুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার জন্য বছরের প্রথম দিনে দেনা-পাওনার হিসাব সমন্বয় করে নতুন খাতা খুলতাম। প্রযুক্তির ফলে এর ব্যাপক আয়োজন না থাকলেও এই দিনকে উপলক্ষ্য করে খদ্দেরদের মিষ্টিমুখ, ফুল এবং বিভিন্ন উপহার দিতাম। এবার সব আয়োজন ছিল।

এ খাতের উদ্যেক্তারা জানান, করোনা সংক্রমণের এই সময়ে স্বর্ণ শিল্পি ও ব্যবসায়ীসহ এখাতের সঙ্গে জড়িত প্রায় ২৫ লাখ মানুষ করুণ দিনাতিপাত করছেন। অনেক স্বর্ণ শিল্পী আছেন যারা গ্রামে চলে গেছেন; তারা সরকারের সহযোগিতা না পেলে না খেয়ে মরতে হবে। এরপরও আমাদের প্রত্যাশা, প্রকৃতির এমন দুর্যোগে যা ক্ষতি হয়েছে হউক; তবু নতুন বছরের এই ভাইরাসকে বিদায় জানিয়ে সবার মধ্যে হাসি ফুটে উঠুক।

হালখাতা ও নববর্ষের আয়োজনে কথা উল্লেখ করে তারা আরো বলেন, সম্রাট আকবরের চালু করা হালখাতা প্রথা এখনো ধরে রেখেছে জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা। ফলে তারা এই উৎসব বিশ্বাস করে। এ ছাড়া সারা বছরের বকেয়া অনেক ক্রেতা এই সময় দেয়। এটা প্রায় শতকোটি টাকার বেশী। এই বকেয়া পাওনার বড় মৌসুম থেকে সবাই আমরা বঞ্চিত হবো। এ ছাড়া সামনে রোজা ও ঈদ এই সময় দোকান খোলা রাখা যাবে কিনা; এই নিয়েও রয়েছে অনেক আশংকা।

স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের প্রাণের ও ঐতিহ্যের উৎসব নববর্ষ উদযাপন না করতে পারায় বড় ধরনের আর্থিক ও ব্যবসায় ক্ষতি মুখে পড়েছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির সহসভাপতি, অলংকার নিকেতনের মালিক ও বসুন্ধরা সিটি শপিং মার্কেটের মালিক সমিতির সভাপতি এম এ হান্নান আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, হালখাতা আর নববর্ষ উদযাপন নিয়ে প্রতিবারের মতো এবারও ব্যপক আয়োজন থাকলেও করোনা সংক্রমণের কারণে আজ প্রায় এক মাস দোকান বন্ধ। ফলে এই মার্কেটের ১৪ হাজার ব্যবসায়ীর আজ মাথায় হাত পড়েছে! কিভাবে চলবে। এক সপ্তাহের ব্যয় মেটানোর সামর্থ থাকলেও আজ আর তারা চলতে পারছেন না।

সরকারের প্রণোদনার কথা উল্লেখ করে হান্নান আজাদ বলেন, বড় বড় উদ্যেক্তাদের জন্য প্রণোদনার কথা বলা হলেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রণোদনার জন্য নেই কোনো সঠিক দিকনির্দেশনা। তাই ব্যবসায়ী নেতা হিসেবে তার দাবি ক্ষুদে ব্যবসায়ীরা ‘যতদিন ব্যবসা করতে পারবে না; ততদিন যেন তাদের ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ করা হয়।’ এ ছাড়া মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের সময় বাড়িয়ে দেওয়া আহ্বান জানান তিনি।

দেশের স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের লোকসানের কথা তুলে ধরে বাজুসের সহসভাপতি বলেন, দেশে প্রায় ১০ হাজারের মতো স্বর্ণের দোকান রয়েছে। তাদের প্রতি মাসে দোকান ভাড়া, ইউটিলিটি বিল এবং কর্মচারী মজুরিসহ প্রায় ৩৫ কোটি টাকা খরচ হয়। ব্যবসা বন্ধ থাকায় এই দায় কিভাবে চালাবে এই নিয়ে কঠিন সংকটের মধ্যে আছে তারা।

বাজুসের সাবেক সভাপতি ও চন্দ্রিমা জুয়েলারির মালিক ওয়াদুদ খান বলেন, ‘জীবন নিয়ে শংকায়। সামাজিক দূরত্ব কেউ মানছি না। এর ফলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ছে। এরসঙ্গে এই মহামারি প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য সব বন্ধ। হিমশিম খেতে হচ্ছে ব্যবসায়ী-কর্মচারী সবাইকে। তাই সরকারের কাছে আমার আহবান দোকান কর্মচারীদের প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভেবে দেখে।

তিনি আরো বলেন, হালখাতা ও নববর্ষের আয়োজনে জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা সারা বছরের বকেয়া আদায় করে। অনেক ক্রেতা এই সময় নতুন করে অর্ডারও দেয়। এটা প্রায় শতকোটি টাকা। এই থেকে সবাই আমরা বঞ্চিত হবো। এ ছাড়া সামনে রোজা ও ঈদ এই সময় দোকান খোলা রাখা যাবে কিনা; এই নিয়েও রয়েছে অনেক আশংকা।

আরও সংবাদ

মন্তব্য করুন

Back to top button