ধর্ম

যেসব সুরার সূচনা শপথবাক্য দিয়ে

এখনই সময় :

কোরআন মাজিদে রয়েছে ১১৪টি সুরা। এসব সুরা দুই ভাগে বিভক্ত। মাক্কি ও মাদানি। যেসব সুরা মহানবী (সা.)-এর হিজরতের আগে অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলো মাক্কি সুরা। আর যেসব সুরা মহানবী (সা.)-এর হিজরতের পরে অবতীর্ণ হয়েছে সেগুলোকে মাদানি সুরা বলে। মাক্কি ও মাদানি সুরাগুলোর বৈশিষ্ট্য ভিন্ন ভিন্ন। মহানবী (সা.) মাক্কিজীবনে ভিন্ন স্বভাবের একটি পণ্ডিত জাতিকে নতুন দ্বিনের দাওয়াত দেন। যা তাদের কাছে ছিল অতি আশ্চর্যের বিষয়। যে স্বভাব দীর্ঘদিন ধরে তারা নিজেদের মধ্যে লালন করেছিল কী করে তা বর্জন করা যায়। তাই মক্কার কাফিররা নতুন দ্বিনকে শুধু প্রত্যাখ্যানই করেনি; বরং এ দ্বিনকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করার সব অপকৌশল ও যড়যন্ত্র করেছে। কিন্তু তারা যতই ষড়যন্ত্র করেছে, আল্লাহ তাআলা তাঁর দ্বিনকে ততই শক্তিশালী করেছেন। কাফিরদের অসত্য মনে করা বিষয়কে সত্য বলে প্রমাণিত করার জন্য আল্লাহ তাআলা ২৩টি সুরায় শপথবাক্য ব্যবহার করেছেন। সুরাগুলো হলো—

১. সুরা ইয়াসিন : সুরা ইয়াসিন কোরআন মাজিদের ৩৬তম সুরা। এ সুরা মহানবী (সা.)-এর মাক্কিজীবনের শেষ পর্যায়ে অবতীর্ণ হয়। মক্কার কুরাইশ কাফিররা অত্যন্ত জোরেশোরে মহানবী (সা.)-এর নবুয়তকে অস্বীকার করছিল। আল্লাহ তাআলা এ শপথবাক্য পেশ করেন— ইয়াসিন (১) বিজ্ঞানময় কোরআনের শপথ, (২) অবশ্যই আপনি রাসুলদের অন্তর্ভুক্ত।

২. সুরা আস-সাফফাত : সুরা আস-সাফফাত কোরআন মাজিদের ৩৭তম সুরা। এটি মহানবী (সা.)-এর মক্কার জীবনের শেষ দিকে অবতীর্ণ হয়। মক্কার কাফিররা আল্লাহ তাআলাকে এক বলে বিশ্বাস করত না। তারা ছিল মুশরিক, তারা দেবদেবির পূজা করত এবং বহু স্রষ্টায় বিশ্বাসী ছিল। আল্লাহ তাআলা এ সুরার শুরুতে তিনটি শপথ করে বিষয়টি ব্যক্ত করেছেন যে আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়।

৩. সুরা সাদ : এটি কোরআন মাজিদের ৩৮তম সুরা। মহানবী (সা.)-এর নবুয়তের দশম কিংবা দ্বাদশ বছর এ সুরা নাজিল হয়। আল্লাহ তাআলা শপথ করে কুরাইশদের সত্য প্রত্যাখ্যান করার কারণ বর্ণনা করেছেন।

৪. সুরা জুখরুফ : এটি কোরআন মাজিদের ৪৩তম সুরা। মহানবী (সা.)-এর হিজরতের আগে এ সুরাটি অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ তাআলা এ সুরায় শুরুতে শপথ করে বলেছেন যে এ কিতাবের রচয়িতা মুহাম্মদ (সা.) নন; বরং আমি আল্লাহ। সুতরাং তোমরা এ কিতাবকে বিশ্বাস করো।

৫. সুরা আদ-দুখান : এটি কোরআন মাজিদের ৪৪তম সুরা। মক্কার জীবনে হিজরতের আগে অবতীর্ণ হয়। এ সুরায় কোরআন অবতীর্ণের সময় শপথের মাধ্যমে ব্যক্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে যে কোরআন নাজিল হয়েছে বরকতপূর্ণ রজনীতে।

৬. সুরা ক্বাফ : এটি কোরআন মাজিদের ৫০তম সুরা। এ সুরাটি নবুয়তের পঞ্চম বছর নাজিল হয়। রাসুল (সা.)-কে অস্বীকার করা যে মহাভ্রান্তি এবং বিবেকবুদ্ধির পরিপন্থী তা শপথের মাধ্যমে এ সুরায় ব্যক্ত করা হয়েছে।

৭. সুরা আজ-জারিয়াত : এটি কোরআন মাজিদের ৫১তম সুরা। মাক্কিজীবনের কঠিন মুহূর্তে এ সুরা অবতীর্ণ হয়। এ সুরায় শপথের মাধ্যমে বলা হয়েছে যে এ পৃথিবী কোনো উদ্দেশ্যহীন ও অনর্থক বালু-মাটির খেলাঘর নয়; বরং এটি একটি পরিপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি কাজ কোনো না কোনো উদ্দেশ্য ও উপযোগিতা সামনে রেখে হয়।

৮. সুরা আত-তুর : এটি কোরআন মাজিদের ৫২তম সুরা। এ সুরায় পাঁচটি শপথের মাধ্যমে বলা হয়েছে যে আখিরাত সত্য। সেদিন পাপী অবশ্যই শাস্তি ভোগ করবে, যা রোধ করার ক্ষমতা কারো নেই।

৯. সুরা আন-নাজম : এটি কোরআন মাজিদের ৫৩তম সুরা। নবুয়তের পঞ্চম বছর এ সুরা অবতীর্ণ হয়। এ সুরায় মুহাম্মদ (সা.) যে নবী ও অহির মাধ্যমে আদেশ-নিষেধ করেন। আর তিনি পথভ্রান্ত ও বিপথগামী নন তা আল্লাহ তাআলা শপথের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন।

১০. সুরা আল-কলম : এটি কোরআন মাজিদের ৬৮তম সুরা। মাক্কিজীবনের প্রথম দিকে এ সুরা নাজিল হয়। এ সুরায় শপথ করে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি রয়েছে আল্লাহর মহা অনুগ্রহ। ফলে তিনি উন্মাদ নন, যা কাফিররা মনে করেছে।

১১. সুরা আল-কিয়ামাহ : এটি কোরআন মাজিদের ৭৫তম সুরা। এ সুরায় শপথের মাধ্যমে বলা হয়েছে যে কিয়ামতের আগমন নিশ্চিত ও অনিবার্য।

১২. সুরা আল-মুরসালাত : এটি কোরআন মাজিদের ৭৩তম সুরা। মাক্কি যুগের প্রথম দিকে তা অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ তাআলা শপথের মাধ্যমে বলেছেন যে প্রতিশ্রুত জিনিস তথা কিয়ামত ও আখিরাত অবশ্যই সংঘটিত হবে।

১৩. সুরা আন-নাজিআত : এটি কোরআন মাজিদের ৭৯তম সুরা। তা মক্কায় অবতীর্ণ হয়। শপথ দ্বারা, বাক্য দ্বারা এ সুরার সূচনা। এ সুরায় শপথ করে বলা হয়েছে যে যাঁর হুকুমে ফেরেশতারা মানবের প্রাণ হরণ করে, তাঁরই হুকুমে একদিন বিশ্ব ধ্বংস হবে।

১৪. সুরা আল-বুরুজ : এটি কোরআন মাজিদের ৮৫তম সুরা। মাক্কিজীবনের কঠিন সময়ে তা অবতীর্ণ হয়। এ সুরায় তিনটি শপথের মাধ্যমে বলা হয়েছে যে ঈমানদারদের সঙ্গে কৃতকর্মের ফল কাফির-মুশরিকরা একদিন পাবে।

১৫. সুরা আত-তারিক : এটি মক্কায় অবতীর্ণ ৮৬তম সুরা। এ সুরায় শপথের মাধ্যমে বলা হয়েছে যে এক আল্লাহই পৃথিবীর সব কিছুর স্রষ্টা ও রক্ষক।

১৬. সুরা আল-ফজর : এটি কোরআন মাজিদের ৮৯তম সুরা। মাক্কিজীবনে তা অবতীর্ণ হয়। এ সুরায় শপথের মাধ্যমে মক্কাবাসীদের আদ, সামুদ ও ফিরাউন জাতির করুণ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে।

১৭. সুরা আল-বালাদ : এটি মাক্কিজীবনে অবতীর্ণ কোরআন মাজিদের ৯০তম সুরা। আল্লাহ তাআলা এ সুরায় শপথ করে বলেছেন, মুহাম্মদ (সা.)-ই মক্কা নগরীর বৈধ নাগরিক, কাফির-মুশরিকরা অবৈধভাবে বসবাসকারী। একদিন তারা উচ্ছেদ হয়ে যাবে।

১৮. সুরা আশ-শামস : এটি কোরআন মাজিদের ৯১তম সুরা। মাক্কিজীবনের প্রথম দিকে এ সুরা অবতীর্ণ হয়। এ সুরায় শপথের মাধ্যমে সৎ-অসৎ এবং পাপ-পুণ্যের পার্থক্য বোঝানো হয়েছে।

১৯. সুরা আল-লাইল : এটি কোরআন মাজিদের ৯২তম এবং মাক্কি নবম সুরা। মাক্কিজীবনের প্রথম দিকে তা অবতীর্ণ হয়। এ সুরায় জীবনের ভিন্ন ভিন্ন দুটি পথের পার্থক্য ও পরিণাম বর্ণনা করা হয়েছে।

২০. সুরা আদ-দুহা : এটি কোরআন মাজিদের ৯৩তম এবং একাদশ মাক্কি সুরা। এ সুরায় শপথের মাধ্যমে মহানবী (সা.)-কে সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছে যে অহি নাজিলের সিলসিলা বন্ধ হবে না।

২১. সুরা আত-তিন : এটি কোরআন মাজিদের ৯৫তম এবং ২৮তম মাক্কি সুরা। এ সুরায় তিনটি শপথের মাধ্যমে বলা হয়েছে যে মানুষকে সর্বোত্তম কাঠামোয় সৃষ্টি করা হয়েছে।

২২. সুরা আদিয়াত : এটি কোরআন মাজিদের ১০০তম এবং চতুর্দশ মাক্কি সুরা। এ সুরায় শপথের মাধ্যমে বলা হয়েছে যে যুদ্ধের ঘোড়া মনিবের নির্দেশে যুদ্ধের মাঠে শত্রুদের সামনে চলে যায়। কিন্তু সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ তাদের রবের প্রতি বড়ই অকৃতজ্ঞ।

২৩. সুরা আল-আসর : এটি কোরআন মাজিদের ১০৩তম এবং মাক্কি ত্রয়োদশ সুরা। এ সুরায় ঈমানদার, সৎকর্মশীল, পারস্পরিক সত্যের উপদেশদাতা এবং পারস্পরিক ধৈর্যের উপদেশদাতা ছাড়া সব মানুষ ক্ষতিতে নিমজ্জিত বলে শপথের মাধ্যমে ব্যক্ত করা হয়েছে।

লেখক : প্রধান ফকিহ, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী

আরও সংবাদ

মন্তব্য করুন

Back to top button