ধর্ম

আল্লাহর ওপর আস্থা ও সতর্কতা গ্রহণের নীতি

এখনই সময় :

ভাগ্যে বিশ্বাস ও ইসলামী শরিয়ত অনুমোদিত উপায়-অবলম্বন গ্রহণের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই; বরং মানুষের কাজও কর্মফলের মতোই পূর্বনির্ধারিত। যদি কেউ মনে করে, আল্লাহ উপকরণ ও কার্যকারণ ছাড়া কোনো কাজ এবং তার ফল নির্ধারণ করেছেন, তবে সে ভাগ্য বিশ্বাসের মৌলিকত্ব থেকে সরে গেল এবং আল্লাহর ওপর অপবাদ দিল। ঝাড়ফুঁক ও ওষুধ সম্পর্কে জনৈক প্রশ্নকারী রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, এগুলো কি আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত কোনো কিছু ফিরিয়ে দিতে পারে? নবীজি (সা.) বললেন, এগুলোও আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। রাসুল (সা.) ও তাঁর সাহাবিরা প্রাত্যহিক জীবনে পার্থিব উপায়-উপকরণ গ্রহণ করতেন। নবীজি (সা.)-এর জীবনচরিত তার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত।

বর্তমানে সারা পৃথিবী করোনাভাইরাসে সৃষ্ট এক মহামারিতে আক্রান্ত। এই মহামারি আল্লাহ কর্তৃক পূর্বনির্ধারিত। তদ্রূপ মহামারি থেকে পরিত্রাণের জন্য উপায়-উপকরণ অবলম্বন করাও আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত; মহামারির এই প্রাদুর্ভাবে তা আবশ্যকও। মহানবী (সা.) আল্লাহর ওপর সর্বোচ্চ আস্থাশীল সত্ত্বেও পার্থিব উপায়-উপকরণ গ্রহণ করতেন। তিনি যেসব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন সেগুলো তাঁর পার্থিব উপকরণ গ্রহণের চূড়ান্ত ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। অথচ যুদ্ধগুলো আল্লাহর ইচ্ছা ও ভাগ্যলিখন অনুযায়ী পরিচালিত ছিল। রাসুল (সা.) যুদ্ধে সৈন্য বাহিনী প্রস্তুত করেছেন, নিরাপত্তার জন্য পাহারাদার নিযুক্ত করেছেন। তথ্য সংগ্রহের জন্য গুপ্তচর প্রেরণ করেছেন। আত্মরক্ষার জন্য বর্ম ও শিরস্ত্রাণ পরিধান করেছেন। জীবন রক্ষার্থে আবিসিনিয়া (ইথিওপিয়া) ও মদিনা অভিমুখে মুসলিমদের হিজরতের অনুমতি দিয়েছেন এবং নিজে হিজরত করেছেন। অথচ তিনি ছিলেন আল্লাহর ওপর সবচেয়ে বেশি আস্থাশীল।

আল্লাহর ওপর ভরসা ও সতর্কতা গ্রহণ

বান্দার জন্য আল্লাহর সৃষ্ট ও নির্দেশিত অবলম্বন গ্রহণের মূলনীতি হলো—সে বিশ্বাস করবে, আল্লাহই এসব উপায়-উপকরণের স্রষ্টা এবং তা ব্যবহারের উপকারিতা তাঁরই নির্ধারিত বিষয়। তিনি ইচ্ছা করলে উপকরণ গ্রহণ সত্ত্বেও উপকার থেকে বঞ্চিত করতে পারেন। সব উপকরণ উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তা থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য আল্লাহর ওপরই পূর্ণ আস্থা ও ভরসা রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে বেশির ভাগ আলেম বলেন, তাওয়াক্কুল অর্জনের জন্য মুমিন আল্লাহর প্রতিশ্রুতির প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখবে, আল্লাহর সিদ্ধান্ত অবশ্যই কার্যকর হবে—এই বিশ্বাস রাখবে, জীবিকা অন্বেষণ ও প্রয়োজনীয় খাদ্য-পানীয় গ্রহণের সুন্নত অনুসরণ করবে, শত্রু থেকে সুরক্ষার জন্য অস্ত্র-সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখবে, নিরাপত্তার জন্য দরজা লাগিয়ে রাখবে ইত্যাদি। এসব প্রস্তুতি গ্রহণ সত্ত্বেও উপায়-উপকরণের ওপর তার অন্তর তৃপ্ত থাকবে না; বরং বিশ্বাস করবে, এসব অবলম্বন নিজে উপকার বা ক্ষতি কোনোটাই করতে পারে না। কার্যকারণ ও কার্যফল উভয়টি আল্লাহর ইচ্ছার প্রতিফলন মাত্র। সব কিছুই তাঁর ইচ্ছায় ঘটে। সুতরাং কেউ যদি শুধু এসব বাহ্যিক উপায়-উপকরণের ওপর ভরসা করে তবে তার তাওয়াক্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হলো।

কার্যফলে উপায়-উপকরণের প্রভাব

কিছু উপায়-উপকরণ এমন, যা মানুষ স্বভাবতই জানে। যেমন—সহবাস সন্তান জন্মের, বীজ রোপণ ফসল উৎপন্নের, খাদ্য গ্রহণ ক্ষুধা নিবারণের এবং পানীয় গ্রহণ তৃষ্ণা মেটানোর কারণ। আর কিছু আসবাব এমন—যা নিয়ে কিছু মানুষের দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে। যেমন—আল্লাহর শরিয়তের অনুসরণ ইহকাল ও পরকালে সুখ লাভের মাধ্যম এবং শরিয়তবিমুখতা ইহকাল ও পরকালে দুর্ভাগ্যের কারণ। আর কিছু উপকরণ এমন, যা বেশির ভাগ মানুষের কাছে অস্পষ্ট। যেমন—সামাজিক ঘটনাবলির কারণগুলো। বিভিন্ন জাতির সম্মান-অসম্মান, উত্থান-পতন, অভাব-সচ্ছলতা, জয়-পরাজয়; তদ্রূপ এমন কিছু ঘটনাবলি আছে, যার কারণগুলো ফলাফল বয়ে আনে। কারণ পাওয়া গেলে ফলাফল না পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এগুলো প্রাকৃতিক ঘটনাবলির মতো। যেমন—পানি জমাট বাঁধা, বাষ্পীভূত হয়ে বৃষ্টিপাত হওয়া।

প্রাকৃতিক ও সামাজিক ঘটনাবলির মধ্যে পার্থক্য হলো—প্রথম ঘটনাবলির কারণগুলো সুশৃঙ্খলবদ্ধ, যা জানা গেলে ফলাফল সম্পর্কে জানার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আর সামাজিক ঘটনাবলির কারণগুলো বহুমাত্রিক, আপেক্ষিক এবং নিশ্চিতভাবে তার ফলাফলের সময় নির্ধারণ করা কঠিন। তবে ফলাফলের নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব। কোরআন-হাদিসের বহু স্থানে কারণ পাওয়া গেলে ফলাফল পাওয়া যাবে—এই সাধারণ নীতির ব্যাপারে নির্দেশনা রয়েছে।

উপকরণ অস্বীকার করা নির্বুদ্ধিতা

কোরআন দ্বারা প্রমাণিত আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর নির্দেশনার মূল উৎস শরীয় আসবাব বা কার্যকারণ এবং তা পূর্বনির্ধারিত। আল্লাহর সৃষ্টি ও কার্যকারণে কোনো পরিবর্তন নেই। তাঁর আদেশের কোনো বিকৃতি নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আপনি আল্লাহর রীতির কোনো পরিবর্তন পাবেন না এবং আল্লাহর নীতির কোনো বিকৃতি পাবেন না।’ (সুরা : ফাতির, আয়াত : ৪৩)

সুতরাং উপায়-উপকরণ অস্বীকার করা নির্বুদ্ধিতা এবং ইসলামী শরিয়তের প্রতি একটি আঘাত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ আকাশ থেকে যে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, তা দিয়ে মৃত জমিন পুনরুজ্জীবিত করেন।’ (সুরা : আল বাকারা, আয়াত : ১৬৪)

মুমিন ব্যক্তি উপায়-উপকরণ গ্রহণ করবে। কেননা তাকে তা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহই এসবের প্রতিক্রিয়া বা ফলাফল নির্ধারণ করবেন। মুমিন বান্দাকে আল্লাহর দয়া, সমতা, প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে হবে। কেননা তিনিই বিশ্বস্ত আশ্রয়দাতা এবং ধোঁকা ও প্রবঞ্চনা থেকে মুক্তিদাতা। ইরশাদ হয়েছে, ‘শয়তান তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীল কাজের নির্দেশ দেয়; আর আল্লাহ তোমাদের তাঁর ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। আল্লাহ প্রশস্ত জ্ঞানের অধিকারী।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৬৮)

মহামারির সময় সাহাবিদের বিশ্বাস ও সতর্কতা

সাহাবারা এই মর্মার্থ ভালোভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁরা বুঝেছিলেন তাকদিরে বিশ্বাস অর্থ উপায়-উপকরণ ছেড়ে দেওয়া নয়। এ জন্য ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রা.)-এর তাকদিরের প্রতি যে বিশ্বাস ছিল তা গ্রহণ করেননি, যা বিখ্যাত ‘আমওয়াস মহামারি’তে ঘটেছিল। ওমর (রা.) যখন শামের (সিরিয়া) সীমান্ত এলাকা থেকে মদিনায় ফিরে আসতে চাইলেন, তখন আবু উবায়দা ইবনুল জারাহ (রা.) বললেন, আপনি কি আল্লাহর তাকদির থেকে পালিয়ে যাবেন? ওমর (রা.) এই প্রশ্নে হতবাক হয়ে গেলেন এবং বললেন, ‘আবু উবায়দা! তুমি ছাড়া অন্য কেউ এ কথা বললে মেনে নেওয়া যেত! হ্যাঁ, আমরা আল্লাহর এক তাকদির থেকে আরেক তাকদিরের দিকে পালাচ্ছি। এরপর তিনি বললেন, মনে কর তুমি একটি উপত্যকায় উট নিয়ে গেলে। ওই উপত্যকার দুটি অংশ রয়েছে। একটি উর্বর, আরেকটি অনুর্বর। তুমি উর্বর অংশে উট চরালে সেটা আল্লাহর তাকদির অনুযায়ী। আবার তুমি অনুর্বর অংশে উট চরালে সেটাও আল্লাহর তাকদির অনুসারে।

ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ও আবু উবায়দা (রা.) উভয়ে জানতেন, তাকদির হলো ভবিষ্যতের ঘটনাবলি সম্পর্কে আল্লাহর পূর্বজ্ঞান। তবে ওমর (রা.) মনে করতেন কার্য ফলাফলের সঙ্গে আসবাব বা কার্যকারণকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে তাকদিরের কোনো ভূমিকা নেই। কাজেই মহামারি থাকাবস্থায় শামে প্রবেশ করা হবে মৃত্যুর কারণ। আর মহামারি থেকে মুক্তির জন্য ফিরে যাওয়া হবে আসবাব বা অবলম্বন গ্রহণ। সুতরাং কোনো কাজের জন্য অগ্রসর হওয়া বা কোনো কাজ থেকে পিছু হটার সঙ্গে তাকদিরকে সম্পৃক্ত করা সঠিক নয়। আবার তাকদিরের দোহায় দিয়ে উপায়-উপকরণ ত্যাগ করা সঠিক নয়। (সংক্ষেপিত)

আলজাজিরার ব্লগ ‘মুদাওয়ানাত’ থেকে সাইফ মুরতাফির অনুবাদ

 

Related Articles

Leave a Reply

Back to top button
Close